আমার বন্ধু হুমায়ুন ফরীদি

ইমদাদুল হক মিলন
হুমায়ুন ফরীদির সঙ্গে পরিচয় বাহাত্তর সালের শেষ দিকে। সে তখন নারায়ণগঞ্জে থাকে। গেন্ডারিয়া থেকে মাহমুদ শফিকের সঙ্গে প্রায়ই নারায়ণগঞ্জে যাই। শফিক কবিতা লেখেন। নারায়ণগঞ্জে থাকেন তার বন্ধু মুজিবুল হক কবীর। তিনিও তরুণ কবি। কবীরের বাবা সিরাজুল হক সাহেব ‘কালের পাতা’ নামে মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। বাড়িতেই পত্রিকার কার্যালয়।
শফিক আমাকে প্রথমে নিয়ে গিয়েছিলেন কবীরদের বাড়িতে। সেখান থেকে কবীর আমাদের নিয়ে আসেন ‘আলম কেবিন’ নামের একটি রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টের সামনে চওড়া ফুটপাতে বসে তিন যুবক আড্ডা দিচ্ছে। আড্ডার একজন ছিল ফরীদি। পরিচয়ের পর আমি প্রায়ই নারায়ণগঞ্জে গিয়ে তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম। গেন্ডারিয়ার লোহারপুলের পূর্বদিকের ঢালে নারায়ণগঞ্জের বাস থামত। ওই বাসকে বলা হতো ‘মুড়ির টিন’। আট আনা ভাড়ায় নারায়ণগঞ্জ।
ফরীদি তখন থেকেই অন্যরকম। জামাকাপড়ের ঠিক নেই। লুঙ্গি আর ছেঁড়া শার্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সিগারেট টানছে আর হা হা করে হাসছে। আমাদের চা খাওয়ার পয়সা ছিল না বলে এক বিকালে তাদের দোতলার বাসায় নিয়ে সবাইকে চা খাইয়েছিল। সেই জীবনের পর ফরীদির সঙ্গে যোগাযোগ কমে গিয়েছিল। সে চলে গেল জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে পড়তে। সেখানে সেলিম আল দীনের সঙ্গে তার পরিচয়। সেলিম ভাইয়ের ওখানে আড্ডা দিতে গিয়ে আফজাল হোসেনের সঙ্গে পরিচয়। আফজাল ওকে ‘ঢাকা থিয়েটার’-এ নিয়ে এলো। এসব বোধহয় ছিয়াত্তর সালের কথা। ফরীদি মঞ্চে অভিনয় শুরু করল, টেলিভিশনে অভিনয় শুরু করল। তার পরের ঘটনা পুরোটাই ইতিহাস। অভিনয় জগতে তার উত্থান ও কিংবদন্তি হয়ে ওঠা কারও অজানা নয়।
বিটিভিতে আমি ধারাবাহিক নাটক লিখতে শুরু করেছি, ‘কোন কাননের ফুল’। প্রযোজক ফখরুল আবেদিন দুলাল। এক দুপুরে বসে আছি দুলালের রুমে। ফরীদি এসে হাজির। বলল, ‘আমি তোর নাটকে অভিনয় করব। আমার চরিত্র লেখ।’ আমি মোটামুটি গল্প সাজিয়ে ফেলেছি। ফরীদির করার মতো চরিত্র নেই। কিন্তু ফরীদি অভিনয় করতে চাইছে। আমার প্রিয় বন্ধু। প্রথম পর্ব ধারণ করা হয়ে গেছে। সেদিন থেকে এডিটিং শুরু হবে। ফরীদির আগ্রহের কথা দুলালও শুনেছে। সে একটা অদ্ভুত কাজ করল। বিটিভির এক দেয়ালের পাশে ফরীদিকে দাঁড় করিয়ে কয়েকটি শর্ট নিল। প্রথম পর্বের শেষ দৃশ্যে কোনো কারণ ছাড়াই ফরীদির একটি শর্ট লাগিয়ে দিল। সেই শর্টেই ফ্রিজ হলো নাটক। অর্থাৎ ফরীদি আসিতেছেন। দ্বিতীয় পর্বেও একই কায়দায় ফরীদির ওপর শেষ হলো নাটক। তার চরিত্র এলো তৃতীয় পর্ব থেকে।
বিটিভির সিনিয়র প্রযোজক কামরুন নেসা হাসান। তার ডাকনাম মেনকা। আমরা ডাকি ‘মেনকা আপা’। ফরীদিকে আর আমাকে খুবই ভালোবাসেন আপা। আমার কয়েকটি এক ঘণ্টার নাটক করেছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আমার লেখা সাত পর্বের একটি ধারাবাহিক নাটক করবেন। প্রধান ভূমিকায় থাকবে হুমায়ুন ফরীদি। ফরীদি তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। মঞ্চ বা টেলিভিশনে অভিনয় করার সময় নেই। সিনেমায় প্রবলভাবে জেঁকে বসেছে। সুবর্ণার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছে। দুই মহাতারকার আনন্দময় সংসার। চমৎকার ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে সিদ্ধেশ্বরীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উল্টো দিকটায়। আপার সঙ্গে আমি একদিন গেলাম সেই ফ্ল্যাটে। প্রস্তাবটা আপা দিলেন। শুনে ফরীদি আমার দিকে তাকাল। ফুরুক ফুরুক করে চায়ে দুটো চুমুক দিল। সিগারেটে দুটো টান দিল। তারপর অভিনয় করতে রাজি হয়ে গেল। মেনকা আপাকে সেই মুহূর্ত থেকে ‘দিদি’ বলে ডাকতে শুরু করল।
তখন ১৫ দিনে একটি করে পর্ব প্রচার হয়। এক পর্ব প্রচার হওয়ার পর পরের পর্ব লিখতে বসি আমি। এ সময় ফরীদির সিনেমার শুটিং পড়ে গেল কক্সবাজারে। ফরীদি চলে গেল সেখানে। আপা আর আমি মহাদুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমাদের নাটকের কী হবে? ফরীদি আমাকে বলল, ‘কক্সবাজার চলে আয়। আমি সিনেমার শুটিং করব, আর তুই হোটেলে বসে লিখবি। সন্ধ্যার পর দুই বন্ধু আড্ডা দেব।’ আমি এক রাতে নাইট কোচে চড়ে কক্সবাজার চলে গেলাম। ফরীদি আমাকে পেয়ে খুব খুশি। দুই বন্ধু এক রুমে থাকি। সকালে নাশতা করে ফরীদি চলে যায় শুটিংয়ে। আমি বসে বসে নাটক লিখি।
একদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙেছে। হোটেলের বারান্দা থেকে ভোরবেলার সমুদ্র দেখে মাথাটা খারাপ হয়ে গেল। ফরীদি ঘুমাচ্ছে। অনেকখানি বালিয়াড়ি ভেঙে আমি সমুদ্রতীরে গিয়ে দাঁড়ালাম। সমুদ্রের মহান সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রইলাম। ফিরে এসে দেখি ফরীদির ঘুম ভেঙেছে। জানতে চাইল, কোথায় গিয়েছিলাম। বললাম। শুনে সে এক মুহূর্ত কী যেন ভাবল। তারপর শুটিংয়ে চলে গেল। দুপুরবেলা দেখি আমার খাবারের সঙ্গে বিশাল এক কাতলা মাছের মাথা। বেয়ারা বলল, ‘ফরীদি সাহেব পাঠিয়েছেন।’ আমি ভড়কে গেলাম। এত বড় মাছের মাথা একা খাওয়া অসম্ভব। যতটা পারলাম খেলাম। অত বড় কাতলা মাছের মাথা সেদিনের আগে বা পরে জীবনে আমি আর খাইনি। বোধহয় চোখেও দেখিনি। শুটিংয়ে ফরীদির জন্য স্পেশাল খাবারের ব্যবস্থা থাকে। সেদিন ছিল ওই কাতলা মাছের মাথা। নিজে না খেয়ে ফরীদি সেটা বন্ধুকে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আহা রে, আমার বন্ধুটি!
পরদিন ভোরবেলায়ও সমুদ্রতীরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। সেখানে কেউ নেই। আমিও ছিলাম সমুদ্রের মতোই নিঃসঙ্গ। শুধু দূরে দুজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। ফিরে এসে নাশতা খেতে বসেছি। ফরীদি বলল, ‘বিচে কী দেখলি?’ আমি তো সমুদ্র ছাড়া আর কিছু দেখিনি। ‘বলিস কী? দুজন লোক দেখিসনি?’ বললাম, ‘দেখেছি।’ শুনে সে স্বস্তি পেল। বলল, ‘ওদের আমি পাঠিয়েছিলাম তোকে পাহারা দেওয়ার জন্য। ভোরবেলার সিবিচ নিরাপদ না। নানা রকমের ঘটনা ঘটে। এজন্য তোকে কিছু না জানিয়ে পাহারাদার রেখে দিয়েছিলাম।’ এই ছিল আমার বন্ধু হুমায়ুন ফরীদি।
একদিন দুপুরবেলা হঠাৎই হোটেলে ফিরে এলো ফরীদি। উদাস, বিষণ্ন। আনমনা ভঙ্গিতে সিগারেট টানছে। ‘কী হয়েছে রে?’ ফরীদি চেয়ারে বসে বলল, ‘খারাপ খবর আছে। তুই কান্নাকাটি করিস না। খবরটা পাওয়ার পর শুটিং করতে ইচ্ছা করেনি। প্যাকআপ করে চলে এসেছি।’
উৎকণ্ঠায় আমার তখন দম বন্ধ হয়ে এসেছে। ‘কী হয়েছে, বল?’ ফরীদির ওই আগের কথা। ‘তুই কিন্তু কান্নাকাটি করিস না। ইলিয়াস ভাই মারা গেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।’ বলে নিজেই কাঁদতে লাগল। দরদর করে ফরীদির গাল বেয়ে কান্না নামল। ইলিয়াস ভাইকে হারানোর দুঃখে আমরা দুই বন্ধু অনেকক্ষণ কাঁদলাম। দিনটি ছিল ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি।






