হাম যাবে, ভয়াবহতা থাকবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
“সূঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হয়”—বাংলা ভাষার একটি বহুল উচ্চারিত প্রবাদ। সূঁচ বা সূঁই হলো একটি ছোট জিনিস এবং ফাল হচ্ছে লাঙ্গলের ফলা, যা সূঁচের তুলনায় অনেক বড়। প্রবাদটির ভাবার্থ হচ্ছে, শুরুতে খুব ছোট এবং তেমন ক্ষতিকর মনে না হলেও পরে ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে। হামের সংক্রমণের সঙ্গে প্রবাদটির বেশ মিল রয়েছে। হামের ভাইরাস একজন শিশু বা মানুষের শরীরে প্রবেশ করার পর চুপচাপ ঘাপটি মেরে বসে থেকে আপন সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে। তারপর যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার পর রোগীর শরীরে আক্রমণ শানানো শুরু করে। তখন আক্রান্তের শরীরে জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, গলাব্যথা ও কাশি, চোখ লাল ও চোখ দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি উপসর্গ ও লক্ষণ দেখা দেয়। হামের ভাইরাসের এই ঘাপটি মেরে থাকার সময় সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন হয়ে থাকে। তবে এই সময়কাল ক্ষেত্রভেদে ৩ থেকে ২৩ দিন পর্যন্ত হতে পারে। ঘাপটির এই সময়কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সুপ্তিকাল বা ইনকিউবেশন পিরিয়ড’ বলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আমাদের এমনটাই জানিয়েছে।
হাম একটি অতি সংক্রামক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ। একজন রোগী থেকে ১৮ জন পর্যন্ত হামের সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তীব্র জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি, গলাব্যথা, লাল চোখ ইত্যাদি লক্ষণ দিয়ে হাম শুরু হয়। জ্বর দিয়ে হামের শুরু হয়। তবে জ্বরের ৩ থেকে ৫ দিনের মাথায় মুখমণ্ডল, শরীর ও হাতে-পায়ে একধরনের লাল ফুসকুড়ি বা র্যাশ হয়। এই র্যাশ হামের প্রধান পরিচয়চিহ্ন। র্যাশ দেখা দেওয়ার চার দিন আগে এবং চার দিন পর পর্যন্ত রোগীর শরীর থেকে হামের ভাইরাস ছড়াতে থাকে। হামের ৭০-৮০ শতাংশ রোগীর মৃদু পর্যায়ের রোগ হয়। এদের তেমন কোনো চিকিৎসার দরকার হয় না। তবে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মধ্যম এবং তীব্র পর্যায়ের রোগে ভোগে। এদের অধিকাংশকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। কারো কারো আইসিইউর দরকার হয়। উন্নত দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা সাধারণত প্রতি এক হাজার রোগীতে ১-২ জন। তবে আমাদের মতো দেশগুলোতে এই সংখ্যা প্রতি এক হাজার রোগীর মধ্যে ৫-৬ জন হয়ে থাকে। হামের প্রধান প্রধান জটিলতা হচ্ছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে সংক্রমণজনিত ক্ষত, কানে সংক্রমণ এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ ইত্যাদি। হামে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো হচ্ছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ। তবে চোখের ক্ষতের জন্য আংশিক বা সম্পূর্ণ অন্ধত্ব এবং কানের সংক্রমণের জন্য বধিরতা হতে পারে।
হাম থেকে সেরে ওঠার পর সব রোগী কি পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে? পরবর্তীতে তারা কি কোনো ধরনের অসুস্থতা বা জটিলতায় আক্রান্ত হয়? এই প্রশ্ন দুটির উত্তরে বেরিয়ে আসে হামের ভয়াবহতার মূল চিত্র। হামের ভাইরাস আক্রান্তের শরীরে প্রবেশের পর হামের লক্ষণ ও উপসর্গ তৈরি করার বিষয়টি স্বাভাবিক। কিন্তু এর বাইরেও এই ভাইরাস রোগীর শরীরে একটি মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। সেটা হলো রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউনিটিকে তছনছ করে দেয়। এতে রোগী হাম ছাড়াও অন্য রোগ, যেগুলোর বিরুদ্ধে তার শরীরে আগে থেকেই প্রতিরোধশক্তি ছিল, সে শক্তিকেও অকার্যকর করে দেয়। এই অবস্থাকে ডাক্তারি ভাষায় ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’ বলা হয়। ইমিউন অর্থ রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং অ্যামনেশিয়া অর্থ স্মৃতিভ্রষ্টতা। মানুষের দেহে কোনো রোগজীবাণু প্রবেশ করা মাত্র শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী বাহিনী সেটাকে শনাক্ত করে। তখন সেই জীবাণুকে পরাজিত এবং ধ্বংস করার জন্য একটি বিশেষ অস্ত্র তৈরি করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ‘অ্যান্টিবডি’ বলেন। রোগজীবাণু হলো ‘বডি’ এবং সেটার বিরুদ্ধে যা তৈরি হয়, সেটাই হলো ‘অ্যান্টিবডি’। এরপর শরীরের ভেতর ‘বডি’ এবং ‘অ্যান্টিবডি’র মধ্যে যুদ্ধ বাধে। যুদ্ধে জীবাণু বা বডি জয়ী হলে শরীরে রোগ দেখা দেয়। কিন্তু অ্যান্টিবডি জিতে গেলে শরীর রোগাক্রান্ত হয় না। জীবাণু এবং অ্যান্টিবডির যুদ্ধের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, এই অ্যান্টিবডিটি দেহের রোগ প্রতিরোধতন্ত্রের মধ্যে স্মৃতি হিসেবে সঞ্চিত থাকে। পরবর্তী যেকোনো সময়ে সেই জীবাণু ওই ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করলে আগে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডির সাহায্যে শরীর জীবাণুটিকে অতি সহজে শনাক্ত করে ও প্রতিরোধ করে। এই ক্ষমতা জীবনব্যাপী অথবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হতে পারে। টিকাদানের মাধ্যমেও এরকম অ্যান্টিবডি বা প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা যায়। এখনকার সময়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের শরীরে ১৫টির মতো রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা হয়। ফলে পরবর্তীতে শিশুরা এসব রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত থাকে। ভয়াবহ বিষয় হলো, হামের সংক্রমণের কারণে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধতন্ত্রে একধরনের স্মৃতিভ্রষ্টতা তৈরি হয়। এতে তার অবস্থাটি অনেকটা নবজাতকের শরীরের মতো হয়ে যায়। এ অবস্থায় রোগীর শরীর চেনা বা অচেনা সব ধরনের রোগজীবাণু প্রবেশের সহজ ক্ষেত্রে পরিণত হয়। হাম থেকে সেরে ওঠা এসব রোগীর ১১ থেকে ৭৩ শতাংশের শরীরে এই ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া বা রোগ প্রতিরোধতন্ত্রের স্মৃতিভ্রষ্টতা’ হয়ে থাকে। তখন পোলিও, হুপিং কফ, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, মাম্পস ইত্যাদি রোগের টিকা নেওয়া সত্ত্বেও শুধু হাম-পরবর্তী ইমিউন অ্যামনেশিয়ার জন্য তাদের শরীরে এই রোগগুলো হতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা জাতীয় ভাইরাসের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানসম্মত কারণে আমাদের দেশের মানুষের একধরনের প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউনিটি আছে। ইমিউন অ্যামনেশিয়ার কারণে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সাধারণ ভাইরাস পরবর্তীতে মারাত্মক, এমনকি জীবনঘাতী রূপে আবির্ভূত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ইমিউন অ্যামনেশিয়ার সময়কাল ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা হচ্ছে, হামের পর আরো কতগুলো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে, ক্ষেত্র প্রস্তুত।
সেরে যাওয়ার পরেও হাম ভাইরাস কিছু কিছু রোগীর মস্তিষ্কে সুপ্তভাবে থেকে যায়। সাত থেকে দশ বছর পরে এই ভাইরাস ধীরে ধীরে পুরো মস্তিষ্কে একধরনের ‘আংশিক তীব্র’ প্রদাহ তৈরি করে। ডাক্তারি ভাষায় একে ‘সাবঅ্যাকিউট স্কেলোরাইজিং প্যানএনসেফালাইটিস’ বলা হয়। এ রোগে রোগীর চটপটে ভাব ও বুদ্ধিশুদ্ধি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে, খিঁচুনি হয় এবং স্মৃতিভ্রষ্টতা তৈরি হয়। হামের এই জটিলতায় আক্রান্ত হলে সাধারণত লক্ষণ দেখা দেওয়ার ১-৩ বছরের মধ্যে ৯৫ শতাংশ রোগী মারা যায়। বাকিরা পরবর্তী এক বছরে মৃত্যুবরণ করে। হাম আক্রান্ত রোগীর ১০ হাজারের মধ্যে ১ জনের এই জটিলতা দেখা দেয়। তবে রোগীর বয়স যত কম হবে, এই জটিলতার হার তত বেশি হয়। এক বছরের কম বয়সী শিশুর প্রতি ৬০০ জনের মধ্যে একজনের এই অবস্থা হয়। বাংলাদেশে হাম-পরবর্তী সময়ে এই বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের মনে রাখতে হবে।
হামে আক্রান্ত অনেক রোগীর মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস হয়। সাধারণত প্রতি ১ হাজার রোগীর মধ্যে ১ জন হামকালীন অবস্থায় মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হয়। গড়ে এদের ১০ শতাংশ মারা যায় এবং বাকিরা ভালো হয়ে ওঠে। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের অনেকের স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যের হ্রাস এবং বুদ্ধিবৈকল্য, আচরণের নেতিবাচক পরিবর্তন, কমবেশি বধিরতা ইত্যাদি হয়।
হামের সময়ে রোগীর চোখের প্রদাহ হয়। হাম সেরে যাওয়ার পরে এই প্রদাহজনিত কারণে চোখ আংশিক বা পূর্ণ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। হামে আক্রান্ত রোগীর মধ্যকর্ণে প্রদাহ হয়ে থাকে। হাম থেকে সেরে ওঠার পরে অনেকের কানের প্রদাহ থেকে যায়। পরে ধীরে ধীরে কানের পর্দা ফুটো, আংশিক বা সম্পূর্ণ বধিরতা ইত্যাদি হয়।
হামের ভাইরাসের কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফুসফুসের প্রদাহ হয়। ফুসফুসের প্রদাহ থেকে নিউমোনিয়া হয়। এই প্রদাহের জন্য অনেক সময় ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়। এজন্য হাম থেকে সেরে ওঠা অনেক রোগীর ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ অথবা ব্রঙ্কিয়েক্টেসিসের মতো রোগ তৈরি হয়। ব্রঙ্কিয়েক্টেসিস রোগে স্থায়ী ধরনের কাশি, শ্বাসকষ্ট, ঘন ঘন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, কাশতে কাশতে হাঁপিয়ে ওঠা ইত্যাদি হয়ে থাকে।
হাম যে একটি ভয়াবহ অতি সংক্রামক রোগ, এটা বাংলাদেশের মানুষ ভুলে গিয়েছিল। আমরা বিগত কয়েক দশকে হামের কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু দেখিনি। অনেক বছর ধরে কোনো মা ভাবেননি, হামের মতো একটি রোগের কারণে তাঁর প্রাণের ধন, নয়নের মণি শিশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে, তাঁর কোল খালি হবে। এ অর্জন সম্ভব হয়েছিল সফলভাবে শিশুদের টিকাদানের মাধ্যমে। টিকাদানের মাধ্যমে এ দেশে শিশু মৃত্যুর হার অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। আমাদের এই সফলতাকে সারা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে, পুরস্কৃত করেছে। অথচ রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, দায়িত্বজ্ঞানহীন কার্যকলাপ, জনসাধারণের জীবনের প্রতি ক্ষমার অযোগ্য উদাসীনতা প্রদর্শনের কারণে এ বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, হামের মহামারি হয়। মহামারি এখনো চলমান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিশুদের টিকাদান বন্ধ করে দেয়। টিকা না পেয়ে লাখ লাখ শিশু হামসহ আরো কতগুলো রোগের বিরুদ্ধে অরক্ষিত হয়ে পড়ে। দেশে হামের মহামারিসুলভ সংক্রমণের দুয়ার খুলে যায়। ইতোমধ্যে সরকারি হিসাবে সাড়ে পাঁচশোর মতো শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রতিদিন মৃত্যুর এই বেদনাদায়ক মিছিল শুধু বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কত শিশু, কত মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছে, সে হিসাব সত্যিকার অর্থে বের করা অসম্ভব। কারণ আমাদের দেশে হাম পরীক্ষার ব্যবস্থা খুবই সীমিত। যেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগীর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেখানে আমাদের হামের পরীক্ষা করার সামর্থ্য দৈনিক ২০০ থেকে ৪০০-র মতো। ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করে, হাজারো মায়ের বুক খালি করে হাম একদিন চলে যাবে। কিন্তু রেখে যাবে হামের ভয়ংকর প্রভাব। তাতে কত শিশুর মৃত্যু হবে, কত শিশুর জীবনে বৈকল্য, স্মৃতিভ্রষ্টতা, অন্ধত্ব, বধিরতা, শ্বাসতন্ত্রীয় জটিলতা ইত্যাদি নেমে আসবে, তার হিসাব কেবল ভবিষ্যৎ দিতে পারবে। এজন্য যাদের দায়িত্বহীনতা এবং অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে এই ভয়াবহ দুর্দশা জাতির ওপর নেমে এসেছে, তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা দরকার। এজন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হোক।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ






