ভঙ্গুর অর্থনীতিতে উপজেলা নির্বাচন: প্রয়োজন নাকি আড়ম্বর?

প্রাবন্ধিক লিটন আব্বাস
দেশের অর্থনীতি পার করছে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও রূপান্তরকালীন এক সময়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়। এমন কঠিন বাস্তবতায় রাষ্ট্রের প্রতিটি পয়সার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। একটি রাষ্ট্রের সার্বিক টেকসই উন্নয়ন মূলত নির্ভর করে তার সুশাসন ও সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টনের ওপর। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক জাঁতাকলের মধ্যেও আমরা বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্থানীয় সরকারের ধাপে ধাপে নির্বাচন ও বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো রাখছি টিকিয়ে। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে শত শত কোটি টাকা খরচ করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বা জেলা পরিষদে মনোনয়নভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, তা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন।
বিশ্ব জুড়ে যখন অর্থনৈতিক মন্দার হাওয়া বইছে, তখন উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশই কঠোরভাবে গ্রহণ করছে ‘ব্যয় সংকোচন নীতি’ বা অস্টেরিটি মেজার্স। এমন প্রেক্ষাপটে দেশে শুধু আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখতে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ব্যয় যুক্তিযুক্ত নয় কোনোভাবেই। নির্বাচনের এই বিশাল ব্যয়ের এখানেই শেষ নয়; বরং এর পরবর্তী ধাপে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের গাড়ি, প্রটোকল, অফিস রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিতে ফি বছর খরচ হবে বিপুল পরিমাণ অনুৎপাদনশীল রাজস্ব। সাধারণ জনগণের পকেট কাটা করের টাকার এমন অপচয় কোনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। উপরন্তু, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে প্রায়ই হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লোপাট। ফলে এ ধরনের নির্বাচন কাঠামোগত অপচয়কে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে আমাদের দেশে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা দীর্ঘকাল ধরে রেখে আসছে কার্যকর ভূমিকা। আবার উপজেলা পর্যায়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারি আমলা বা উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগ) কাজ করছে সার্বক্ষণিক। এ দুইয়ের মধ্যে আলাদা করে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের পদটি উল্টো তৈরি করে প্রশাসনিক দ্বৈততা বা ওভারল্যাপিং। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নির্বাচিত এই পদের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবে জটিলতা তৈরি হয় সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে। একই সঙ্গে এটি আবির্ভূত হয় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ তছরুপের একটি নতুন রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে।
যদি মধ্যবর্তী এই স্তর বাদ দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে সরাসরি আরও শক্তিশালী করা যেত, তবে সম্ভব হতো রাষ্ট্রের বিপুল অপচয় রোধ। ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে সরাসরি উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে জবাবদিহির আওতায় আনলে স্থানীয় সরকার হবে আরও সুঠাম ও গতিশীল।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলো কীভাবে শক্তিশালী হবে? এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন জনপ্রতিনিধিদের সম্মানী ও ভাতার আমূল সংস্কার। বর্তমানে একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে কার্যত চব্বিশ ঘণ্টাই নিয়োজিত থাকতে হয় জনগণের ‘সেবায়’। অথচ তাদের যে সরকারি সম্মানী দেওয়া হয়, তা নিত্যপণ্যের বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল এবং বাস্তবতাবিবর্জিত। এই আর্থিক অসংগতিই স্থানীয় সরকার দুর্বল হওয়ার এবং দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ। দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপ, নেপাল বা ভুটানের মতো দেশগুলো সুশাসন নিশ্চিতে তাদের স্থানীয় পরিষদের প্রতিনিধিদের দেয় আকর্ষণীয় সম্মানী। বাংলাদেশেও যদি ‘মিনিমাম গভর্নমেন্ট, ম্যাক্সিমাম গভর্ন্যান্স’ বা সীমিত সরকার ও সর্বোচ্চ শাসননীতি গ্রহণ করা যায়, তবে এই মধ্যবর্তী স্তরের শত শত কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব। আর সাশ্রয় হওয়া সেই অর্থ দিয়ে শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতের বড় বৈষম্য দূর এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের উপযুক্ত সম্মানী দেওয়া সম্ভব অনায়াসেই।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত। অথচ বাংলাদেশে এ দুই মৌলিক খাতের বাজেট বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও সর্বনিম্ন।
ইউনেসকোর বৈশ্বিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, একটি দেশের মোট জিডিপির কমপক্ষে ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১.৫ থেকে ১.৮ শতাংশ। অথচ চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া পাকিস্তানের বরাদ্দও ১ শতাংশের নিচে নামার আগে ছিল ১.৯ শতাংশ। এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয় ভুটান, যা প্রায় ৭ থেকে ৮.১ শতাংশ। এ ছাড়া ভারতে ৪.৬ শতাংশ এবং নেপালে ৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করা হয় শিক্ষা খাতে। ভিয়েতনামের মতো কারিগরি ও আইটিনির্ভর দক্ষ জনবল তৈরি করতে না পারলে বাংলাদেশ কখনোই তার ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা তরুণ জনশক্তির সুফল তুলতে পারবে না ঘরে।
একই ধরনের করুণ চিত্র দৃশ্যমান স্বাস্থ্য খাতেও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মানদণ্ড অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মাত্র ০.৬৭ থেকে ১ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। অথচ মালদ্বীপ তাদের জিডিপির ৯.২৫ শতাংশ ব্যয় করে স্বাস্থ্যে। এমনকি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও শ্রীলঙ্কা ৩.৬৮ শতাংশ, নেপাল ৬.১৬ শতাংশ এবং পাকিস্তান বরাদ্দ রাখছে ১.২ থেকে ২ শতাংশ। ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ বা সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী কোনোদিনই উপভোগ করতে পারবে না টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন। কারণ, চিকিৎসার পেছনেই শেষ হয়ে যায় সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত আয়ের সিংহভাগ।
দক্ষিণ এশিয়ায় মাথাপিছু আয়ের বিচারে মালদ্বীপ (~$১৬,০০০+) ও ভুটান (~$৪,৮৬০) রয়েছে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৯৬০ ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে রয়েছে ভারতের (~২,৮১০) কাছাকাছি অবস্থানে। দীর্ঘ সময় জাতিসংঘের ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ (এলডিসি)-এর তালিকায় থাকার পর ভুটান এরই মধ্যে সফলভাবে বের হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ও নেপালও ২০২৬ সালের এই বর্তমান সময়ে যাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
এই ঐতিহাসিক উত্তরণের সময়ে আমাদের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের ফাঁদ হচ্ছে আরও গভীর। ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ এবং অর্থ তছরুপের সংস্কৃতি থেকে যদি আমরা বের হতে না পারি, তবে উন্নয়নশীল দেশের তকমা হবে না টেকসই। সস্তা জনপ্রিয়তার রাজনৈতিক নীতি বা মেগা প্রকল্পের মোড়ক দিয়ে করা যায় না রাষ্ট্র বিনির্মাণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম আজ নেতৃত্ব দিচ্ছে তৈরি পোশাকের বিশ্ববাজারে। সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া কঠোর শৃঙ্খলা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে পরিণত হয়েছে উন্নত রাষ্ট্রে।
একইভাবে উন্নয়নের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকেও এখন যেতে হবে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’র মতো আমূল, সাহসী এবং কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে। উপজেলা নির্বাচনের মতো ব্যয়বহুল এবং অনুৎপাদনশীল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পেছনে শত শত কোটি টাকার বাজেট অপচয় স্থগিত করা উচিত অবিলম্বে। এই বিপুল অর্থ আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, কোল্ড-চেইন তৈরি বা কৃষকদের সরাসরি ভর্তুকি দিতে ব্যবহার করা দরকার। একই সঙ্গে সমূলে দুর্নীতি উপড়ে ফেলতে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও কঠোর আইনের তাৎক্ষণিক প্রয়োগ করতে হবে নিশ্চিত। অন্যথায়, পদ্ধতিগত ভুলের কারণে সৃষ্ট ঋণের পর্বত চেপে বসবে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের কাঁধে। আর ‘উন্নত বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন কেবল একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় নীতিগত প্রহসন হয়েই থাকবে।
‘ব্যয় সংকোচন’ নীতি গ্রহণ যদিও শুধু মুখের কথা নয়; বাস্তবায়নে রয়েছে হাজারো প্রতিবন্ধকতা। তবুও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কাঠামোগত ও সাহসী সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা হোক নির্মোহ।
লেখক: প্রাবন্ধিক
ইমেইল: [email protected]






