থামেনি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন, ছড়িয়েছে আরও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল ও কারখানার উৎপাদন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত রবিবার সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করলেও আন্দোলন থামেনি।
আন্দোলনের মধ্যে গতকাল সোমবার ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া এবং গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের আরও প্রায় ৪০০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলে ২৬৪টি এবং গাজীপুরে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আন্দোলন ঘিরে মিরপুরের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি মামলা হয়েছে এবং গতকাল দুপুর পর্যন্ত ২৯ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারে গতকাল গাজীপুরে মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১০ প্লাটুন সদস্য।
আন্দোলনের সূত্রপাত মূলত দীর্ঘদিনের মজুরি অসন্তোষ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ থেকে। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি, বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। এর আগে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে উত্তরা ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট পরিসরে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিক নেতাদের একাংশ নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য ডিসেম্বরের আগেই উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। গত শনিবার আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। পরদিন রবিবার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।
মজুরি বোর্ড গঠন, তবু থামেনি বিক্ষোভ
শ্রমিকদের আন্দোলন ও অসন্তোষের মধ্যে রবিবারই সরকার পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। মালিকপক্ষও শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায়। তবে বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও শ্রমিকরা তাদের দাবি পূরণ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকায় গতকালও বিক্ষোভ করেছেন। শ্রমিকদের একাংশ ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির পাশাপাশি চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার প্রথা বন্ধের দাবিও জানাচ্ছেন। গতকাল গাজীপুর শিল্পাঞ্চল ছিল উত্তপ্ত। দুপুর ১টা পর্যন্ত গাজীপুরের দুই মহাসড়ক ছিল শ্রমিকদের দখলে। থেমে থেমে মহাসড়ক দুটির বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক-পুলিশ পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে বিজিবির সদস্য ও দুই সাংবাদিক আহত হয়েছেন। চন্দ্রা ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করা হলে সড়কের দুপাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। পল্লী বিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকায় অন্তত ৫০টি যানবাহনে ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে প্রায় চার ঘণ্টা বন্ধ ছিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফতুল্লার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তারা সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকাল ৫টার দিকে শ্রমিকরা সড়ক থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
রাজধানীর মিরপুরে গতকাল সকাল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান দেখা যায়। শ্রমিকরা মিরপুর-১৪ ও ২ নম্বর এলাকায় জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ দুই দফায় তাদের সরিয়ে দেয়। একপর্যায়ে কাঁদানে গ্যাসও নিক্ষেপ করা হয়।
মামলা-গ্রেপ্তার, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও বাড়ছে। গতকাল পর্যন্ত মিরপুর বিভাগের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ১৩ হাজার আসামি করা হয়েছে। দুপুর পর্যন্ত ২৯ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। গাজীপুরের বিক্ষোভের ঘটনায় পৃথক তিন মামলায় প্রায় চার হাজার আসামি করা হয়েছে।
শ্রমিক আন্দোলনে বহিরাগত ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, শ্রমিক আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতার পেছনে সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর অবস্থানের কথাও জানানো হয়েছে।
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যৌক্তিক ও মানসম্মত নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও নবগঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার। গতকাল বিকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে ব্রিফিংকালে এমন মন্তব্য করেছেন তিনি।
মালিকদের উদ্বেগ, সমাধানের অপেক্ষায় শ্রমিকরা
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মালিকদের আশঙ্কা, উৎপাদন বন্ধ থাকলে সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এতে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নতুন রপ্তানি আদেশ হারানোর ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। মালিকপক্ষের বক্তব্য, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
অন্যদিকে শ্রমিকদের বক্তব্য, বর্তমান বাজারদরে ১২ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে জীবনযাপন করা কঠিন। শুধু মজুরি বোর্ড গঠন নয়, দ্রুত নতুন মজুরি নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা চান তারা।
তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিতে সাড়া না দিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। গতকাল বিকালে রাজধানীর পল্টন মোড়ে পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে এসব কথা বলেছেন তিনি। শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশি হামলা ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এ সমাবেশের আয়োজন করে সিপিবি।
এ পরিস্থিতিতে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাক কারখানার মালিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সরকারের লক্ষ্য শ্রমিকদের দাবি ও মালিকদের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করে শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন প্রতিবেদক, গাজীপুর; নারায়ণগঞ্জ ও সাভার প্রতিনিধি



