ভারতের নাম মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ফাইল ছবি
ভারত নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সারাক্ষণ প্রতিবেশী দেশটিকে নিয়ে না ভেবে স্বদেশের দিকে মনোযোগ ফেরানোর পরামর্শ দিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
তিনি বললেন, ‘সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার—সবসময় খালি ভারতের কথাই ভাবলে চলবে না। নিজের দেশের কথা ভাবুন।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আজ রবিবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে একথা বলেন হুমায়ুন কবির। ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের প্রসঙ্গটি আসে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত সফরের আমন্ত্রণ পেলেও এখনো দেশটিতে যাওয়া হয়নি তার।
নয়াদিল্লিতে সদ্য সমাপ্ত ব্রিকস সম্মেলনেও তারেক রহমানের আমন্ত্রণ ছিল। তবে যথাযথভাবে আমন্ত্রণটি দেওয়া হয়নি বলে তাতে সাড়া দেয়নি ঢাকা।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী আগামী ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। এই সফরে বিষয়বস্তু নিয়েই সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে এসেছিলেন হুমায়ুন কবির।
তিনি জানান, সাধারণ পরিষদে ভাষণে তারেক রহমান বাংলাদেশের ‘নতুন রূপ ও ভিশন’ তুলে ধরবেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার চিন্তা নিয়ে মতবিনিময় করবেন। জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরে বলবেন কীভাবে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি, টেকসই সমাধান ও বিভিন্ন সংকট নিরসনে একটি প্রভাবশালী ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের অংশ নেওয়ার ফাঁকে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তারেক রহমান বৈঠকও করবেন বলে প্রতিমন্ত্রী জানান।
বহুপক্ষীয় ফোরামে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অনীহা নিয়ে নিজের আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘তা মূলত ভারতের বিষয়ে প্রযোজ্য ছিল। ভারতের সাথে আমরা একটি ভালো ও কার্যকর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। তাই প্রথম আলোচনাটি যদি সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সফরের মাধ্যমে হয়, তবে সেটিই সবচেয়ে ভালো। যার সাথে ভালো সম্পর্ক গড়তে চাই, তার সাথে প্রথম দেখাটি বহুপাক্ষিক ফোরামে না হয়ে দ্বিপাক্ষিক হওয়া উচিত।’
বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে একটি স্বৈরাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত ও লুটেরা সরকারের সাথে যে অস্বস্তিকর সম্পর্ক ছিল, সেখান থেকে বের হয়ে আমরা একটি নতুন সম্পর্কের দিকে এগোতে চাই, যা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত, বহুপাক্ষিক ফোরামে নয়।’
সেক্ষেত্রে নিউ ইয়র্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে বলেই কি ধরে নেব- এক সাংবাদিক জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আপনার প্রশ্নটি সঠিক জায়গায় নেই। ভারতের বিষয়টি মাথা থেকে বের করুন।’
সবসময় ভারতের কথা না ভাবার পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যার সাথে যখন দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক কথা বলা দরকার, আমরা অবশ্যই তা বলব। কিন্তু সাইডলাইনে সবার সাথে তো আর দেখা করা সম্ভব নয়। তবে আমাদের অনেক নিমন্ত্রণ থাকবে এবং অনেক দেশের সাথে আলোচনা হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না, এই প্রশ্নে সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, ‘সাইডলাইনের বৈঠকগুলো অনেক সময় শেষ মুহূর্তে ঠিক হয়। সাইডলাইনে কাদের সাথে বৈঠক হবে, তা সময় হলেই আপনারা জানতে পারবেন।’
এবার বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি ‘সাইডলাইন ইভেন্ট’ আয়োজন করবে বলে প্রতিমন্ত্রী জানান।
সীমান্তে হত্যা
ঠাকুরগাঁও সীমান্তে ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর গুলিতে এক বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে এক্ষেত্রে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা জানতে চান এক সাংবাদিক।
জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এসব বিষয় সমাধান করব। আন্তর্জাতিক আইন, সীমান্ত বিধি এবং দুই দেশের চুক্তি মেনে আমাদের সরকার ভারতের সাথে প্রতিটা স্তরে এই উদ্বেগগুলো তুলবে এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা চালিয়ে যাবে।’
ভারতের সঙ্গে ১০১টি চুক্তি পুনর্নিরীক্ষণের যে কথা সংসদের চিফ হুইপ বলেছেন, সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এটি চিফ হুইপের আওতাধীন বিষয়, তিনি এ বিষয়ে সঠিক উত্তর দিতে পারবেন।
সায়মা ওয়াজেদের নিয়োগ ছিল ‘বিতর্কিত’
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের নানা অভিযোগের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকের পদ ছাড়ার প্রসঙ্গটিও আসে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ব্রিফিংয়ে।
তিনি বলেন, ‘এই পদে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নিয়োগটিই ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিতর্কিত। এমন একটি উচ্চপর্যায়ের পদের জন্য তার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা কিছুই ছিল না। একটি স্বৈরাচারী সরকার স্বজনপ্রীতি করে তাকে সেই পদে বসিয়েছিল। স্বৈরাচারী আমলে জালিয়াতি, তথ্য গোপন ও প্রভাব খাটিয়ে তাকে ওই পদে বসানো হয়েছিল।’
‘দুর্নীতির গন্ধ কখনো চেপে রাখা যায় না, এটি প্রকাশ পাবেই। শেখ মুজিব পরিবারের দুর্নীতির দুর্গন্ধ এখন এতটাই স্পষ্ট যে মানুষ সব জায়গায় তা চিনতে পারছে,’ বলেন হুমায়ুন কবির। তিনি মন্তব্য করেন, এমন নিয়োগ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্যও লজ্জাজনক।
আগামী জানুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালকের নির্বাচন রয়েছে। বাংলাদেশে নতুন প্রার্থী দেবে কি না, সেই প্রশ্ন রাখা হয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে আমরা সঠিক যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করব। যেমন মালদ্বীপের প্রার্থীর কথা ভাবা যেতে পারে, যার ভালো ট্র্যাক রেকর্ড ও যোগ্যতা রয়েছে।
অর্থ পাচার প্রসঙ্গ
দেশ থেকে পাচার হওয়ার অর্থ ফেরত আনতে সরকার কয়টি দেশের সঙ্গে কাজ করছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে।
তিনি বলেন, পাচার হওয়া সম্পদ ও অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করছে সরকার। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি অংশীদারি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি যেসব দেশের আইনি ও ফরেনসিক দক্ষতা রয়েছে, তাদের সঙ্গেও কথা হচ্ছে।
‘আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার
মাধ্যমে আমরা জনগণের এই চুরি হওয়া টাকা ও সম্পদ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর, যাতে
তা কোনো ব্যক্তির পকেটে না গিয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় হতে পারে,’ বলেন তিনি।



