সরকারের ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, বলছে টিআইবি
- ঢাকায় অপরাধ, ৪০ শতাংশই কিশোর জড়িত
- ৬০৫ খুন, শিশু নির্যাতন ৩ হাজার ৪৯৬টি
- ১৮৮ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার, ৭জন গ্রেপ্তার
- মধুপুরে আদিবাসী পরিবারকে উচ্ছেদ

ছবি: আগামীর সময়
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংস্থাটি বলেছে, বর্তমান সরকারের আমলেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকায় সংঘটিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোর। বিভিন্ন ধরনের অপরাধে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও রয়েছে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, পিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা থাকলেও তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। কারা হেফাজতে মৃত্যু এবং ক্ষমতাসীন দলের এক নেতাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ার জেরে একজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও তাদের পর্যবেক্ষণে স্থান পেয়েছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ মে ২০২৬ সালের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে টিআইবি।
আজ রবিবার ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারের টিআইবি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ‘শুধু ১০০ দিনের কার্যক্রম দিয়ে একটি সরকারকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা যায় না। তবে এই ১০০ দিনের পর্যবেক্ষণ সামনের দিনের পথ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।’
টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে, মার্চ ও এপ্রিল মাসে মোট ৯০টি ডাকাতি, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ৬০৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া তিনটি দাঙ্গা, ১৯৬টি অপহরণের ঘটনাও আছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩ হাজার ৪৯৬টি। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, ধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশু ৪৯ থেকে ৭১ জন।
মধুপুরে একটি আদিবাসী পরিবারকে রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে উচ্ছেদ করেছে এবং গাইবান্ধায় আন্দোলনরত সাঁওতালদের ওপর হামলায় নারী নেত্রীসহ পাঁচজন আহত হয়েছে। ই-হেলথ কার্ডের পাইলট প্রকল্প পরিকল্পনায় প্রান্তিক ও আদিবাসী এলাকা অনুপস্থিত। প্রান্তিক এলাকায় হামের টিকা নিয়ে প্রচারণা ও যোগাযোগের ঘাটতি, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হামের টিকা ও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত।
সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জলবায়ু, শিক্ষা খাত, বিচার বিভাগ, কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্য খাত, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে টিআইবি।
টিআইবি বলছে, বর্তমান সরকারের আমলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কোনো কারণ উল্লেখ না করে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজনকে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের আমলেও সাংবাদিক নির্যাতন অব্যাহত আছে উল্লেখ করে টিআইবি বলছে, ১০০ দিনে মোট ১৩৩টি ঘটনায় ১৮৮ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। ১২জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলায় ৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। একটি গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গণমাধ্যম অফিসে বিক্ষোভ করার ঘটনাও উঠে এসেছে টিআইবির পর্যবেক্ষণে।
জুলাই গণঅভ্যুথান পরবর্তী সময়ে ‘হয়রানিমূলক মিথ্যা’ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অনেক সাংবাদিকের জামিন না হওয়ার অভিযোগ পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছে টিআইবি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গেপ্তার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনা করায় একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও অবমাননার অভিযোগেও গ্রেপ্তার অব্যহত রয়েছে বলে টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
ইতিবাচক পদক্ষেপ
সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের ইতিবাচক কিছু পদক্ষেপের তথ্যও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে–সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেওয়ার বিশেষ সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর চলাচলে ভিভিআইপি প্রটোকল ও বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করা। প্রধানমন্ত্রী পরিবারের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়া, জ্বালানিসহ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ বাসভবন ব্যবহার না করা।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের প্রটোকল দিতে ডিসি-এসপিদের উপস্থিতির চর্চা বাতিল করা। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ৩টি দেশের সাথে চুক্তি; একটি দেশে পাচারকৃত সম্পদ জব্দ। সরকারি কর্মচারীদের সকাল ৯টায় কার্যালয়ে উপস্থিত ও প্রথম ৪০ মিনিট অন্য কোনো কাজে কার্যালয়ের বাইরে না যাওয়া বাধ্যতামূলক করা এবং অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ও দপ্তর ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, প্রধানমন্ত্রীর সকাল ৯টায় মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত ও তদারকি।
নিজ মন্ত্রণালয়ে দৃশ্যমান সাফল্য প্রমাণে ব্যর্থ বা গাফিলতি প্রমাণিত হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা এবং ৬ মাস পর কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ণের ঘোষণাকে ইতিবাচক বলছে টিআইবি।
এছাড়া কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রধানদের ভাতা, ক্রীড়াবিদদের কার্ড ও ক্রীড়া ভাতা প্রদান কার্যক্রমকেও ইতিবাচক মনে করছে তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন মো. জুলকারনাইন, রাজিয়া সুলতানা, মো. সহিদুল ইসলাম।




