মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বড় চাপে বাংলাদেশ পাকিস্তান

ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোয়। সেই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ সারিতে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাত। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে চলতি বছরও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে এই চাপ অব্যাহত থাকবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আইইএর ইলেকট্রিসিটি মিড-ইয়ার আপডেট ২০২৬ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি ঝুঁকির এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এলএনজি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দামের ওঠানামা এসব দেশের অর্থনীতিতে দ্রুত প্রভাব ফেলে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই দুই দেশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি সাশ্রয়ের ব্যবস্থা নেওয়ায় বিদ্যুতের ব্যবহারও কমেছে।
আইইএ বলছে, কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ফলে বাংলাদেশকে আগের তুলনায় বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে এবং বিদ্যুতের চাহিদা পূরণও কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাব থেকে দেশটি সহজে বেরিয়ে আসতে পারছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কার্যক্রম ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
অন্যদিকে বিশ্ব জুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের প্রসার এবং ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ এর প্রধান কারণ। আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক বিদ্যুতের চাহিদা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়বে। ফলে ২০২৭ সালে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় ৩০ হাজার ৭০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে।
হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে এশিয়া ও ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ২০২২-২৩ সালের জ্বালানি সংকটের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে এবং অনেক দেশকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। যদিও উত্তর আমেরিকা থেকে অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ বাজারের চাপ কিছুটা কমিয়েছে, তবু উচ্চমূল্যের কারণে কয়েকটি দেশ আবার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের আভাসও দিয়েছে আইইএ। সংস্থাটির পূর্বাভাস, ২০২৬ সালেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হবে। চলতি বছর নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮ শতাংশের বেশি বাড়বে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর অংশ দাঁড়াবে ৩৭ শতাংশ।
এদিকে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণ বিশ্ব জ্বালানি খাতে নতুন মোড় আনছে। ২০২৬ সালে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বায়ুবিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে জলবিদ্যুতের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইইএ।
প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে আগামী বছর চীনের বিদ্যুতের চাহিদা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতের ৭ শতাংশ বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে এই প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ২ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা রয়ে গেছে এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতা। আইইএর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম উচ্চপর্যায়ে থাকলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করেছে, বছরের শেষ দিকে শক্তিশালী এল নিনো দেখা দিলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে। একই সময়ে কিছু অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে আবারও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও ২০২৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় ১ শতাংশ বাড়বে। তবে ২০২৭ সালে তা স্থিতিশীল হতে পারে।
এদিকে, এলএনজি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতের পাইকারি দামেও। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের স্পট মার্কেটে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দাম প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও ভারতে ১০ শতাংশের কম বৃদ্ধি পেয়েছে।
আইইএ বলেছে, বড় অর্থনীতিগুলো বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সংকটের ধাক্কা কিছুটা সামাল দিতে পেরেছে। কিন্তু আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই সংকট এখনো বড় ঝুঁকি। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা যতদিন থাকবে, ততদিন দেশের বিদ্যুৎ খাতও অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবে।




