খালেদা জিয়ার জন্মদিনে বিএনপির নানা কর্মসূচি

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্মদিন আজ। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া বেঁচে থাকলে এটা হতো তার ৮২তম জন্মদিন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। প্রয়াত নেত্রীর আত্মার মাগফিরাত কামনা ও তার রাজনৈতিক অবদান স্মরণে দিনটিতে সারা দেশে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের কর্মসূচি নিয়েছে বিএনপি। বেলা ৩টায় রাজধানীর মহাখালী কড়াইল এলাকার টিঅ্যান্ডটি মাঠে দরিদ্র-অসহায় মানুষের মধ্যে অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বেলা ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দোয়া ও মোনাজাত হবে। ঢাকাসহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয় এবং মসজিদে পালিত হবে একই কর্মসূচি।
মায়ের মৃত্যুর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসা তারেক রহমানের জন্য এবার অন্যরকম আবেগের দিনও এটি। বিএনপির প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দলটি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতির শীর্ষে: খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার গল্প বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যতিক্রমী। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর অনেকটা আকস্মিকভাবেই রাজনীতিতে আসেন তিনি। তখন তিনি ছিলেন সাধারণ একজন গৃহবধূ।
দলের নেতাকর্মীদের আহ্বানে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন খালেদা জিয়া। পরে দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা।
১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে ২০ মার্চ দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। একই বছর তার নেতৃত্বে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে স্বল্পসময়ের জন্য এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের বিজয়ের পর তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। ২০০১ সালের নির্বাচনে জোটটি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছিল।
আন্দোলন, কারাবরণ ও দীর্ঘ বন্দিদশা: খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়। এর বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে আন্দোলন, কারাবরণ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা। ওয়ান-ইলেভেনের পর ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন তিনি। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। পরে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় সাজা হলে আবারও কারাবন্দি হন বিএনপির চেয়ারপারসন।
করোনাভাইরাস মহামারীর শুরুতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে কারামুক্তি পান তিনি। তবে দীর্ঘদিন গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’য় অনেকটা বন্দিজীবন কাটাতে হয় তাকে। অসুস্থতার কারণে কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি চাওয়া হলেও তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে তা দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার দীর্ঘ বন্দিদশার অবসান ঘটে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান খালেদা জিয়া। চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন তিনি।
২০২৫ সালের শেষ দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২৩ নভেম্বর তাকে আবার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় ৪০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩০ ডিসেম্বর ভোরে মারা যান খালেদা জিয়া। মৃত্যুর পর সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে।
তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়েরও অবসান ঘটে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন দেশের ইতিহাসে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে। মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই তার দল বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরে। প্রধানমন্ত্রী হন তারই বড় ছেলে তারেক রহমান। ফলে যে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া দীর্ঘ কয়েক দশক সংগ্রাম করেছেন, তার অনুপস্থিতিতে সেই দলের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব এখন তার সন্তানের হাতে।






