চাকরি হারালেন ৮ পুলিশ কর্মকর্তা, কে কোন কারণে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, অনুমতি ছাড়া দায়িত্বস্থল ত্যাগ এবং বিদেশে গিয়ে নির্ধারিত ছুটির পরও ফিরে না আসা- এই তিন অভিযোগে চাকরি হারালেন পুলিশের আট কর্মকর্তা।
তারা হলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আনিসুর রহমান, ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জি, লক্ষ্মীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার তারেক বিন রশিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান, ডিএমপির সাবেক উপকমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার এবং ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের সহকারী পুলিশ সুপার ফারহানা তাসকিন।
এছাড়া বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগে বিভাগীয় তদন্তে অসদাচরণ প্রমাণিত হওয়ায় এক সহকারী পুলিশ সুপারকে (এএসপি) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) এ-সংক্রান্ত পৃথক আদেশ জারি করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরীর স্বাক্ষর করা আদেশে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ আমলে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তার একদিন আগেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছিল। জুলাই আন্দোলন চলার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ধরে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে আটকে রাখার জন্যও সমালোচিত ছিলেন তিনি।
অনুপস্থিত থাকায় হারুনের বিরুদ্ধে এ বছরের ১৫ এপ্রিল বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব থেকে পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে দুই দফায় কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এই আদেশ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কার্যকর বলে জানানো হয়েছে।
রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমানকে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট নৌ পুলিশে সংযুক্ত করা হয়। সেখানে যোগদানের পর ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি অসুস্থতার কথা জানিয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠান। তবে ওই প্রতিবেদনে ছুটির ধরন, মেয়াদ, অবস্থানের স্থান কিংবা চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের উল্লেখ ছিল না। পরে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি। তদন্তে তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব থেকে পলায়ন ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি বরখাস্ত বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জিকে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি ২২ জানুয়ারি সেখানে যোগ দিয়ে তিন সপ্তাহ বিশ্রামের কথা জানিয়ে প্রস্থান প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর আর কর্মস্থলে ফিরে আসেননি।
এ ঘটনায় ওই বছরের ৩ জুলাই শ্যামল মুখার্জির বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে তিনি বরখাস্ত বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার তারেক বিন রশীদ ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। অনুপস্থিতির কারণ জানাতে কয়েক দফায় তাকে নোটিস দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি। তবে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করলেও তার কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি। এখন তাকে বরখাস্ত করা হলো।
বিদেশে গিয়ে ফেরেননি তিন কর্মকর্তা
নৌপুলিশের টাঙ্গাইল অঞ্চলের সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে দেশের বাইরে যান। পরে তিনি ছুটির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর আবেদন করেন। তবে কর্তৃপক্ষ তার আবেদন মঞ্জুর করেনি। নির্ধারিত সময়ের পর তিনিও দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেননি। এ কারণে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে তিনি বরখাস্ত বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিএমপির সহকারী কমিশনার ফারহানা তাসকিন ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে ৪২ দিনের ছুটি নিয়ে কানাডায় যান। পরে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি ছুটি আরও ৩৬ দিন বাড়ানোর আবেদন করেন। পাশাপাশি তিন বছরের জন্য সিপিএ (সিপিএ) কোর্সে অধ্যয়নের ছুটিও চান।
কর্তৃপক্ষ তার আবেদন নাকচ করে দেশে ফিরে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিলেও তিনি ফেরেননি। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে দায়িত্ব থেকে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি। ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ থেকে তার বরখাস্তে আদেশ কার্যকর হয়েছে।
ডিএমপির সহকারী কমিশনার মনিরুজ্জামান সরকার অপরাধবিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য ২০১২ সালে প্রেষেণে যুক্তরাজ্যের কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিনা বেতনে ছুটি নেন তিনি। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছুটির আবেদন করেন।
কর্তৃপক্ষ ছুটির আবেদন নাকচ করে তাকে দেশে ফিরে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিলেও তিনি ফেরেননি। এরপর ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও দায়িত্ব থেকে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে তিনি বরখাস্ত বলে আদেশে বলা হয়েছে।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে বাধ্যতামূলক অবসর
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগে এএসপি কাজী মিজানুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তিনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন।
বিভাগীয় তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্কের অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের আচরণ পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে বলে বিভাগীয় তদন্তে মত দেওয়া হয়।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
বাড়িতে মাদককাণ্ডে সাময়িক বরখাস্ত
রাজধানীর ভাটারা থানার পুলিশ হাউজিং আবাসিক এলাকায় নিজের বাসায় মাদক সেবন ও ডিজে পার্টির আয়োজনের অভিযোগে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একই সঙ্গে তাকে রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুলে (পিএসটিএস) সংযুক্ত করা হয়েছে।
গত ২৫ অক্টোবর জহিরের বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে ৮৪ জন নারী-পুরুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।



