ই-রিকশা বিধিমালায় সংকট বাড়ার শঙ্কা

বুয়েটের তৈরি ই-রিকশা। ছবি: সংগৃহীত
ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা করা হলেও এতে চালকের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, শাস্তি এবং যানবাহনের চলাচলের এলাকা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা হয়নি। বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার সঙ্গেও রয়েছে সমন্বয়হীনতা। এতে ই-রিকশা নিয়ে চলমান সংকটের সমাধানের পরিবর্তে সড়কে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’-এর বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরে শনিবার এক বিবৃতিতে এ আশঙ্কার কথা জানায় সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিধিমালার ৪(১) উপবিধিতে চালকের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর নির্ধারণের পরিবর্তে ‘অনূর্ধ্ব ১৮ বছর’ লেখা হয়েছে। এটি বিধিমালার একটি গুরুতর অসংগতি। অন্যদিকে, একজন জাতীয় পরিচয়পত্রধারীর নামে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হলেও চালকের যোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। বিধি ১০-এ প্রশিক্ষণের কথা বলা হলেও তা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ফলে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়াই ই-রিকশা চালানোর সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, বিধিমালার ১৯ নম্বর বিধিতে নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম এবং অনিবন্ধিত ই-রিকশা চালানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও কোন আইনের কোন ধারায় কী শাস্তি দেওয়া হবে, তা উল্লেখ নেই। পুরনো ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলে দেওয়া বা পোড়ানো, অনুমতি ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা এবং নির্ধারিত জোনের বাইরে ই-রিকশা চালানোর ক্ষেত্রেও কার্যকর ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
ই-রিকশার নিবন্ধন সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে করার ব্যবস্থা রাখা হলেও সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী বিআরটিএর নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স ও ফিটনেস ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী হবে, তা পরিষ্কার করা হয়নি বলে জানিয়েছে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ইলেকট্রিক মোটরযান নিবন্ধন ও চলাচল নীতিমালা এবং ২০২৬ সালের মোটরযান স্ক্র্যাপিং ও রিসাইক্লিং নীতিমালার সঙ্গেও নতুন বিধিমালার সমন্বয় প্রয়োজন। যানবাহনের ফিটনেস, অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল এবং অনিরাপদ যান চলাচল থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে পরস্পরবিরোধী নির্দেশনা থাকলে বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ই-রিকশা কোন সড়কে চলবে, কোন সড়কে চলতে পারবে না, রুট ও জোন কে নির্ধারণ করবে এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরে চলাচল করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ও স্পষ্ট নয়। যাত্রীভাড়া, চার্জিং ও পার্কিং ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তার মান পূরণ না করা যানবাহন চলাচল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা নিয়েও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সভাপতি আবদুল্লাহ মেহেদি দীপ্ত বলেছেন, ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণের বিধিমালায় চালকের যোগ্যতা, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও নিয়ম ভাঙলে শাস্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই পরিষ্কার করা হয়নি। বাস্তবসম্মত সমাধান নিশ্চিত করাই একটি বিধিমালার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। অস্পষ্টতা রেখে বিধিমালা করলে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং নতুন সমস্যা তৈরি হবে।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. ইনজামুল হক বলেছেন, শুধু নিবন্ধনের ব্যবস্থা করে প্রধান সড়কে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত ই-রিকশার চলাচল বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন। ই-রিকশায় কিউআর কোড যুক্ত করলেই তা পর্যবেক্ষণের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠবে না।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবি, ই-রিকশাচালকদের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি যানবাহনের নিরাপত্তার মান, নিবন্ধন ও ফিটনেস পরীক্ষা, নির্দিষ্ট রুট ও জোন, চার্জিং ও পার্কিংয়ের স্থান এবং অনিরাপদ যান চলাচল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয় করে বিধিমালার অসংগতি ও অস্পষ্টতা সংশোধন করতে হবে।
সংগঠনটির মতে, শুধু যানবাহন নিবন্ধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চালক, যানবাহন, সড়ক অবকাঠামো ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে।





