৩০ দিনে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কমার ফর্মুলা

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান
এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা ভয়াবহ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে দেশের মানুষ যখন নাকাল, তখন সমাধানের একটি দ্রুত ফর্মুলা সামনে এনেছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
তার দাবি, সরকারের হাতে থাকা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সব ‘কার্ড’ একসঙ্গে খেলতে পারলে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। এজন্য বন্ধ বা কম উৎপাদনে থাকা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করতে হবে। এতে গ্যাসচালিত কেন্দ্রের ওপর চাপ কমিয়ে সেই গ্যাস শিল্পকারখানায় দেওয়া যাবে।
বর্তমান সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে শিল্প খাত। বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোনো কোনো কারখানা বন্ধও রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে গত ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর এবং পরবর্তী সময়ে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় শিল্পকারখানায় দৈনিক প্রায় ২৫-৩০ কোটি ঘনফুট কম গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ পরিস্থিতিতে শিল্প খাতের সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
এ বাস্তবতায় মাহমুদ হাসান খানের প্রস্তাব— বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পে সেই গ্যাস ফিরিয়ে দিতে হবে। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, বর্তমান সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট সামাল দিতে নানাভাবে চেষ্টা করছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও ‘অ্যাগ্রেসিভ’ সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তার ভাষায়, এখন সরকারের হাতে থাকা সব বিকল্প একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বললেন, দেশে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট। অথচ বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের মতো। এর বড় কারণ বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের বিপুল বকেয়া। তাদের কাছে সরকারের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা।
মাহমুদ হাসান খানের মতে, এই বকেয়ার একটি অংশ পরিশোধ করা অথবা বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের ডেকে দ্রুত উৎপাদনে ফেরার নিশ্চয়তা দেওয়া হলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। তাদের বলা যেতে পারে, প্রয়োজনীয় তেল আমদানির জন্য এলসি খুলুন, বিল পরিশোধ করা হবে; তবে এক মাসের মধ্যে সব কেন্দ্র চালু করতে হবে। কারণ ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগে। এরপর বাকি এক সপ্তাহে বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলো চালুর সুযোগ রয়েছে।
নিজের কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই এবং কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে তিনি জড়িত নন— এসব কথা উল্লেখ করে বিজিএমইএ সভাপতি বললেন, বর্তমানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা গেলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ— দুই সংকটই একসঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব।
তার হিসাব অনুযায়ী, এক মাসের মধ্যে অতিরিক্ত ৩ হাজার মেগাওয়াট তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে আনা গেলে সমপরিমাণ সক্ষমতার তুলনামূলক কম দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখা সম্ভব হবে। এতে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ব্যবহার কমবে। এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে শিল্প, সিএনজি ও আবাসিক খাতসহ অন্য খাতে সরবরাহ বাড়ানো যেতে পারে। তিনি বললেন, সংকটের এ সময়ে সরকারকে এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে গড়ে আড়াই থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। অবশ্য তাপমাত্রা কমে বিদ্যুতের চাহিদা কমলে লোডশেডিংও কিছুটা কমে আসে।
দেশে বর্তমানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সেখান থেকে গড়ে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। লোডশেডিং বেড়ে গেলে বিশেষ করে রাতে, এসব কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হয়। কিন্তু ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যয়বহুল হওয়ায় উৎপাদন বাড়লে পিডিবির লোকসান বাড়ে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও বেড়ে যায়।
এই ব্যয়ের বিষয়টিই তেলভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১০৭ শতাংশ।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফার্নেস অয়েল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আগামীর সময়কে বললেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এমন চিন্তা করা হচ্ছে।
ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমানোরও একটি প্রস্তাব দিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি। তার মতে, বর্তমানে ফার্নেস অয়েল আমদানিতে ৩০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, অন্যদিকে এলএনজি আমদানিতে শুল্ক মাত্র ৫ শতাংশ। এতে একদিকে সরকার ফার্নেস অয়েলের ওপর উচ্চ শুল্ক নিচ্ছে, অন্যদিকে ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে।
তার প্রস্তাব, আগামী ছয় মাস বা এক বছরের জন্য ফার্নেস অয়েল আমদানির শুল্ক ৩০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক। দু-তিন বছর আগেও এই শুল্কের হার কম ছিল। শুল্ক কমানো গেলে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এলএনজিভিত্তিক উৎপাদন ব্যয়ের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে বলে তার দাবি।
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। এই সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে দৈনিক প্রায় ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু এত গ্যাস কখনোই বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে গড়ে ৯০-৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দিয়ে কমবেশি ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে আরও ২০-২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস কমিয়ে শিল্পে দেওয়া হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসবে। তবে দুটি এলএনজি টার্মিনালই এখন সচল হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গেলে বিদ্যুৎ খাতেও গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পকারখানাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প রয়েছে। ফার্নেস অয়েল থেকে প্রতি ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক জ্বালানি ব্যয় হবে প্রায় ৫০-৫৫ কোটি টাকা। শুল্ক কমানো গেলে এই ব্যয় আরও কমানো সম্ভব।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিমও মনে করেন, আপাতত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। তার মতে, এ মুহূর্তে শিল্প খাতকে বাঁচানো জরুরি। তা না হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
তবে এর সঙ্গে একমত নন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, শিল্পের সংকট কাটানো অবশ্যই জরুরি। তা না হলে সরকারের রাজস্ব আয় কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে সংকট মোকাবিলায় ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে সমাধান নয়।
তার মতে, এ মুহূর্তে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করা গেলে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। তার হিসাব অনুযায়ী, এই অর্থ দিয়ে বছরে ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করা সম্ভব, যা ব্যবহার করে তুলনামূলক কম দামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।
ড. শামসুল আলম আরও বললেন, গত দেড় থেকে দুই দশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যেসব লুণ্ঠনমূলক, অন্যায্য ও অসংগত ব্যয় যুক্ত হয়েছে, সেগুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে বাদ দিতে হবে। এতে শুধু বিদ্যুৎ খাতেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তার দাবি, তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তা হলে নতুন করে বড় অঙ্কের ভর্তুকির প্রয়োজনও অনেকটাই কমে আসবে।





