পার হয়ে গেছে ৯ বছর
শুরুই হয়নি ঢাকার পাশে ৩ সরকারি স্কুলের কাজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর ভালো স্কুলগুলোর ওপর চাপ কমাতে ঢাকার পাশের বিভিন্ন এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করায় গোড়ায় গলদ ছিল। এর ফল হিসেবে দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এখনো তিনটির কাজ শুরুই হয়নি। তিনটির অগ্রগতি ১০ থেকে ৩৩ শতাংশ হয়েছে। এছাড়া চারটি ৮৮ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রকল্পের ব্যয় ৬৭০ কোটি থেকে প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০৩ কোটিতে। এছাড়া মেয়াদ ৭ বছর বেড়ে হয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, যথাসময়ে প্রকল্পের সুফল বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি এটিকে গণ্য করা হচ্ছে চরম ব্যর্থ প্রকল্প হিসেবে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের খসড়ায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
এ অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার মাধ্যমে উচ্চ পর্যায়ে পর্যালোচনা করার সুপারিশ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হবে। যাতে ভূমি নির্বাচন, ভূমি অধিগ্রহণ, প্রকল্প ব্যয় এবং বাস্তবায়ন ঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ আগামীর সময়কে বলেছেন, অবশ্যই আইএমইডির সুপারিশগুলো আমলে নেওয়া উচিত। কেননা এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে। সেই সঙ্গে একটি ভালো উদ্যোগের সুফল মিলছে না। প্রকল্পের মনিটরিং জোরদার করা জরুরি। এভাবে সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় জনগণের করের টাকা অপচয়ের সুযোগ নেই। দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
আইএমইডি সূত্র জানায়, প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। পরে তিন ধাপে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রকল্পের অগ্রগতি হতাশাজনক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি নেওয়ার আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হলে ভূমি অধিগ্রহণে যে ধরনের সমস্যা বা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তা অনেকাংশে এড়ানো যেত। কিন্তু, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না হওয়ার কারণে ভূমি চিহ্নিতকরণ এবং অধিগ্রহণে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। ফলে, প্রকল্পের কর্ম-পরিকল্পনা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়নি, যে কারণে একাধিকবার প্রকল্প মেয়াদ বৃদ্ধি করতে হয়েছে।
এছাড়া প্রকল্পের আরডিপিপিতে (সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) দেওয়া প্রকল্পের বর্ণনা, বস্তুনিষ্ঠ যাচাই নির্দেশক, যাচাইয়ের মাধ্যম, গুরুত্বপূর্ণ অনুমান এবং লক্ষ্য উদ্দেশ্য, আউটপুট, ইনপুট দেওয়া থাকলেও বছর ভিত্তিক সময় নির্দেশক কোনো ইন্ডিকেটর দেওয়া নেই। যেমন— কম্পিউটার ও কম্পিউটার সামগ্রী সংগ্রহ সংখ্যা, গবেষণাগার সরঞ্জামাদি সংখ্যা, অফিস সরঞ্জামাদি সংখ্যা, শিক্ষা উপকরণ এবং আসবাবপত্র সংখ্যা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদিসহ, সংগৃহীত সরঞ্জাম, ইত্যাদির কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ নেই। ডিপিপি তৈরিতে এটি একটি উল্লেখযোগ্য ব্যত্যয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সার্বিকভাবে মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পটির ধীরগতি, অপরিকল্পিত স্থান নির্বাচন, এবং বাস্তবায়নকারী ইউনিটের অদক্ষতার কারণে একটি চরম ব্যর্থ প্রকল্প হিসেবে গণ্য করা যায়। প্রকল্প অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং সঠিক তদারকির অভাব প্রকল্পের মূল দুর্বলতা। সময়মতো জমি অধিগ্রহণ না করা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় ধীরগতি, এবং মনিটরিংয়ের অভাবে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েই চলেছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় ৯ বছর পার হলেও কোনো বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং বিশাল ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি সত্যিই হতাশাজনক।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টরা জানান, এ প্রকল্পের প্রকল্প দলিলে বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য শুধু এলাকা নির্দিষ্ট করা ছিল, কিন্তু কোনো জমি সুনির্দিষ্ট করা ছিল না। ফলে নানা জটিলতায় পড়তে হয়েছে।
তিন বিদ্যালয়ের কাজই শুরু হয়নি
রাজধানীর খিলক্ষেতের খিলক্ষেত সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রূপগঞ্জের পূর্বাচল সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সাভারের পূর্বনরসিংপুর সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাজই শুরু হয়নি এখনো।
তিনটির অগ্রগতি ১০-৩০ শতাংশের মধ্যে
নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকার জালকুড়ি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, চিটাগাং রোডের খোদ্দঘোষপাড়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বাড্ডার সাঁতারকুল সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাস্তবায়ন অগ্রগতি এখনো ১০-৩০ শতাংশের মধ্যেই।
৮৮ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে চারটির
সাভারের হেমায়েতপুরের বিলামালিয়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ, কেরানিগঞ্জের পশ্চিমদি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ধামরাইয়ের লাকুরিয়া পাড়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং নবীনগরের বাঁশবাড়ী ও পাথালিয়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অগ্রগতি হয়েছে ৮৮ শতাংশ।




