বিচার চাওয়া বাবাই পারুলের খুনি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সন্তান হারানোর বেদনা পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর শোকগুলোর একটি। সেই শোক বুকে নিয়ে এক বাবা বছরের পর বছর আদালতের সিঁড়ি ভেঙেছেন। থানা, ডিবি, পিবিআই, সিআইডি— একের পর এক তদন্ত সংস্থার দরজায় কড়া নেড়েছেন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়েছেন, একের পর এক নারাজি দিয়েছেন, করেছেন রিভিশন আপিল। তার একটাই দাবি ছিল— নিখোঁজ মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে হবে, অন্তত জানতে হবে তার ভাগ্যে কী ঘটেছে।
কিন্তু ৯ বছর ধরে চলা সেই লড়াইয়ের শেষ প্রান্তে এসে সামনে আসে এমন এক সত্য, যা কল্পকাহিনিকেও হার মানায়। যে বাবা নিজেকে মেয়ের ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, তদন্তে বেরিয়ে আসে— মেয়েকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনিই। হত্যার পর নিজের অপরাধ আড়াল করতেই সাজিয়েছিলেন অপহরণের মামলা। একটি বন্ধ মোবাইল ফোন নাম্বার, পুরনো কললিস্ট এবং পরিবারের ২২ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ— এই তিনটি সূত্রই শেষ পর্যন্ত উন্মোচন করে ৯ বছর চাপা পড়ে থাকা এক শীতল হত্যাকাণ্ডের রহস্য।
পুলিশের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ঘটনাটি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ঘড়িয়া গ্রামের। ২০১২ সালের ২৮ মে কুদ্দুছ মিয়ার মেয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী পারুল আক্তার পাশের গ্রামের জয়নাল মাস্টারের বাড়িতে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে আর ফেরেনি।
পরে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, একই গ্রামের নাসির উদ্দিন বাবুকে বিয়ে করে ১৫ বছর বয়সী পারুল ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছে। এরপর ধীরে ধীরে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এভাবেই কেটে যায় প্রায় তিন বছর।
২০১৫ সালের ২৮ জুলাই মেয়ের খোঁজে আশুলিয়ার জামগড়ায় যান বাবা কুদ্দুছ মিয়া। সেখানে জামাতা নাসির উদ্দিনকে পেলেও পারুলের কোনো সন্ধান পাননি। মেয়ের অবস্থান সম্পর্কে নাসির সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় টাঙ্গাইল আদালতে তার বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগে একটি পিটিশন মামলা করেন কুদ্দুছ মিয়া।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। প্রথমে কালিহাতী থানা-পুলিশ তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এতে সন্তুষ্ট না হয়ে কুদ্দুছ মিয়া নারাজি আবেদন করেন। পরে টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করেও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। আবারও নারাজি দেন তিনি। আদালতের নির্দেশে তদন্ত যায় পিবিআই টাঙ্গাইলে। ঘটনাস্থল আশুলিয়ায় হলেও কোনো অপরাধের প্রমাণ না পেয়ে পিবিআইও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। তাতেও ক্ষান্ত হননি কুদ্দুছ। আবার নারাজি আবেদন করেন।
এরপর তদন্তের দায়িত্ব যায় সিআইডির কাছে। তারাও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছালে চতুর্থবারের মতো নারাজি দেন তিনি। আদালত সেই আবেদন খারিজ করলে দায়রা আদালতে রিভিশন আপিল করেন। পরে আদালতের নির্দেশে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়। সেখান থেকেই মামলার মোড় ঘুরতে শুরু করে।
কুদ্দুছ মিয়া ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ করলে আদালত আশুলিয়া থানাকে মামলা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআই ঢাকা জেলাকে।
তদন্তে নেমে পিবিআই কর্মকর্তারা গুরুত্ব দেন একটি পুরনো তথ্যকে। তারা পারুলের স্বামী নাসির উদ্দিন এবং মামা-শ্বশুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তদন্তে জানা যায়, স্ত্রীকে খুঁজে না পেয়ে ২০১৫ সালেই আশুলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন নাসির। সেই জিডির সূত্র ধরে উদ্ধার করা হয় ঘটনার সময়কার মোবাইল ফোনের কললিস্ট।
সেখানেই পাওয়া যায় একটি বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা মোবাইল নাম্বার। সেই নাম্বারের মালিককে শনাক্ত করতে পারুলের পরিবারের ২২ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারীরা। ধীরে ধীরে তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন বাদী কুদ্দুছ মিয়াই।
অবশেষে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি স্বীকার করেন, মেয়েকে তিনিই হত্যা করেছেন। হত্যাকাণ্ডে তাকে সহযোগিতা করেছিলেন তার পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তি।
পিবিআইর তদন্তে উঠে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য। পরিবারের অমতে নাসির উদ্দিন বাবুকে বিয়ে করায় মেয়ের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন কুদ্দুছ মিয়া। তিনি মনে করতেন, মেয়ের এই বিয়ে তাকে সামাজিকভাবে অপমানিত করেছে। সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় হত্যার পরিকল্পনা।
তদন্তে জানা যায়, বিয়ের প্রায় সাড়ে তিন বছর পর পারুল মোবাইল ফোনে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বামীর সংসার ছেড়ে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল। সে সুযোগই কাজে লাগান কুদ্দুছ। মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাকে স্বামীর বাসা থেকে বের করে আনেন।
এরপর পরিকল্পনায় যুক্ত হন কুদ্দুছের পূর্বপরিচিত মোকা নামে এক ব্যক্তি, যিনি তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী একজন পেশাদার খুনি ও ডাকাত। পরিকল্পনা অনুযায়ী পারুলকে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার কলন্দপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। নির্জন নদীর তীরে ওড়না দিয়ে তার হাত-পা বেঁধে গামছা প্যাঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় তুলশীগঙ্গা নদীতে।
হত্যার পর নিজের অপরাধ আড়াল করতেই মেয়ের স্বামী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা করেছিলেন কুদ্দুছ মিয়া— তদন্তে এমনটিই উঠে এসেছে।
পিবিআই আরও জানায়, মোকা একসময় ওই এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করতেন এবং জায়গাটির নির্জনতা সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল। তাই পরিকল্পিতভাবেই হত্যার স্থান হিসেবে জয়পুরহাটের ওই এলাকাটি বেছে নেওয়া হয়।
এদিকে, ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই পাঁচবিবি থানার পুলিশ তুলশীগঙ্গা নদী থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে হত্যা মামলা করেছিল। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় সিআইডি দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর তদন্ত শেষে মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। পরে মামলাটি নথিভুক্ত হয়ে যায়।
তবে আশুলিয়ার অপহরণ মামলার তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়ার পর পিবিআই ঢাকা জেলার আবেদনে পিবিআই বগুড়া সেই পুরনো মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে। পরে উদ্ধার হওয়া মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষা করে পারুলের মা ও বোনের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
সবশেষে পিবিআই বগুড়া পারুল হত্যা মামলায় তার বাবা কুদ্দুছ মিয়া ও সহযোগী মোকার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৬৪, ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করে। অন্যদিকে, আশুলিয়া থানার অপহরণ মামলায় তদন্তে বাদী নিজেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রমাণিত হওয়ায় এজাহারভুক্ত আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে পিবিআই ঢাকা জেলা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
৯ বছর ধরে চলা এই মামলার পরিসমাপ্তি শুধু একটি হত্যার রহস্য উন্মোচন করেনি; বরং দেখিয়ে দিয়েছে, কখনো কখনো সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠে ন্যায়বিচার দাবি করা মানুষটিই লুকিয়ে রাখেন সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য।




