ভাষা শিখলে ‘বিনা খরচে’ ইতালি যাওয়ার সুযোগ: মাহদী আমিন

ছবি: আগামীর সময়
ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের বিনা খরচে ইতালি যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে সরকার। এ লক্ষ্যে শিগগিরই স্বল্পপরিসরে একটি বিশেষ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর হোটেল রিজেন্সিতে ‘ইতালিতে দক্ষ অভিবাসনের জন্য ভাষা, নাগরিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা জানান তিনি। ঢাকায় ইতালির দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সহযোগী অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
মাহদী আমিন বলেছেন, ইতালীয় ভাষা শিক্ষা, সুনির্দিষ্ট কর্মদক্ষতা অর্জন এবং পেশাগত আচরণ ও মূল্যবোধ বিকাশের এই প্রশিক্ষণ মডেল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার এই পূর্ণাঙ্গ কাঠামো জাতীয় পর্যায়ে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দিতে চায়। বিভিন্ন স্তরে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের রয়েছে পরিকল্পনাও।
‘দক্ষ, নিয়মতান্ত্রিক ও কম খরচে বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিদেশে কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে সম্ভব হলে শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে’— যোগ করেন তিনি।
দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। এজন্য তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশের উপযোগী করে তুলতে হবে। ইতালির এই যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির বিদেশে কর্মসংস্থানের পথ আরও সুগম করবে বলে আশা প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টার।
বর্তমানে ইতালিতে আড়াই লাখের বেশি বাংলাদেশি
দক্ষ অভিবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের অভিজ্ঞতা ও সাফল্য কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেছেন, ইতালির এই উদ্যোগ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় প্রশিক্ষণ মডেলটি অন্যান্য দেশ ও বিভিন্ন পেশাগত খাতেও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন ভাষা শেখার সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সেমিনারে উপস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বললেন, জাতীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ইতালি সরকারের এই ইতিবাচক উদ্যোগ জাতীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত সহায়তা দিতে সরকার প্রস্তুত।
ইতালির বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনার প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, এসব উদ্যোগ নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভবিষ্যতে দক্ষ অভিবাসন সম্প্রসারণে এগুলো নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
বর্তমানে ইতালিতে বসবাসরত আড়াই লাখের বেশি বাংলাদেশির অবদানের কথাও তুলে ধরেন মাহদী আমিন। ‘ইতালির সমাজ ও অর্থনীতিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রবাসীদের প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ ও সফলতার গল্প।’
প্রবাসীদের জন্য চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’
বাংলাদেশের তরুণদের মেধা ও যোগ্যতার কোনো ঘাটতি নেই উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেছেন, মূল চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া, দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
তিনি বললেন, প্রবাসীদের কল্যাণে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের আদলে প্রবাসীদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বোয়েসেলসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দক্ষ অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাহদী আমিন আরও বলেছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তরুণদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আজকের এই সেমিনারে শিক্ষার্থীরা ইতালীয় ভাষা, আধুনিক কর্মদক্ষতা ও পেশাগত নিয়মকানুন শিখছেন। এটি সরকারের তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব প্রতিফলন।
এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইতালীয় ভাষাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষাকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমে নিয়মিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, আপনারা শুধু নিজেদের কর্মজীবন গড়ে তুলছেন না, বরং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষতা ও মর্যাদার সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। ধাপে ধাপে ইতালিতে যাওয়ার মাধ্যমে আপনাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মিশনপ্রধান ড. লরা টম বন্ডে, ইতালির উপমিশনপ্রধান ডা. ফেদেরিকো জামপারেল্লি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের উপপ্রধান বাইবা জারিনা এবং ইতালীয় দূতাবাসের অভিবাসন উপদেষ্টা জুসেপ্পে দি জিওভান্নি।
ইতালির অভিবাসন আইনের ২০২৩ সালের ২৩ ধারা অনুযায়ী, দেশটির শ্রম ও সামাজিক নীতি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত প্রস্থান-পূর্ব প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্ধারিত ‘ফ্লো ডিক্রি’র কোটার বাইরেও দক্ষ কর্মীদের বৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। এসব প্রশিক্ষণে মৌলিক ইতালীয় ভাষা, দেশটির নাগরিকত্ব ও সমাজব্যবস্থা এবং শেখানো হয় সংশ্লিষ্ট পেশার দক্ষতা।
বর্তমানে হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতের ‘টেস্ট’ প্রকল্পের আওতায় ‘ফ্রন্টিয়ার্স স্কিলস’ এবং ‘ফরম্যাজিঅনে’ টেক্সটাইল প্রকল্পের নির্বাচিত প্রশিক্ষণার্থীরা এ সেমিনারে অংশ নেন।



