এমএসএফের প্রতিবেদন
মে মাসে বেড়েছে মব, কমেছে রাজনৈতিক সহিংসতা
- ৩২৬ জন নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণের শিকার ৭৮
- বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিদ্যমান
- নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এখনও উচ্চ ঝুঁকিতে

ছবি—এআই
চলতি বছরের এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে দেশে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে মব সহিংসতা। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, এ সময়ে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ২১ থেকে বেড়ে ৩২ এবং আহতের সংখ্যা ৪৯ থেকে বেড়ে ৭১ জনে পৌঁছেছে। গত ছয় মাসের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ।
আজ রবিবার প্রকাশিত এমএসএফের মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে অন্তত ৬৯টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩২ জন নিহত, ৭১ জন গুরুতর আহত এবং ৩৫ জনকে গণপিটুনির পর আহত অবস্থায় পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে।
গণপিটুনিতে নিহতদের মধ্যে ১৪ জন চুরির অভিযোগে, ৬ জন পূর্বশত্রুতার জেরে, ২ জন ডাকাতির অভিযোগে এবং ২ জন ধর্ষণের চেষ্টা বা নিপীড়নের অভিযোগে প্রাণ হারান।
এছাড়া একজন হত্যার অভিযোগে, একজন ছিনতাইয়ের অভিযোগে, একজন কটূক্তির অভিযোগে এবং একজনকে মাদক কারবারি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। দুর্ঘটনা, চাঁদাবাজি, চুরি করতে বাধা দেওয়া, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, সুদের টাকা ফেরত না দেওয়া এবং বাকবিতণ্ডার জেরেও কয়েকজন নিহত হন।
অপরদিকে, মবের হামলায় গুরুতর আহতদের মধ্যে ২৩ জন পুলিশি বিশেষ অভিযানের সময়, ৫ জন হত্যার অভিযোগে, ৫ জন ধর্ষণের অভিযোগে, ৪ জন জমি-সংক্রান্ত বিরোধে, ৪ জন ধর্ষণের চেষ্টা বা নিপীড়নের অভিযোগে এবং ২ জন চুরির অভিযোগে হামলার শিকার হন। এছাড়া রাজনৈতিক বিরোধ, পরকীয়া, লেনদেন-সংক্রান্ত বিরোধ, প্রতারণা ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে আরও কয়েকজনকে গুরুতর আহত করা হয়।
এমএসএফের মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির এটি স্পষ্ট প্রতিফলন। সংস্থাটি বলছে, মবের মাধ্যমে হত্যা ফৌজদারি অপরাধ এবং তা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক সহিংসতা
এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা, নিহত ও আহতের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে আধিপত্য বিস্তার ও দলীয় কোন্দলকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বিএনপির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং জামায়াতে ইসলামী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে ঘটেছে।
মে মাসে মোট ৩৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ১৯৩ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন বিএনপি কর্মী, একজন জামায়াত কর্মী এবং একজন সাধারণ নারী ছিলেন।
ঘটনাগুলোর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে ১৬টি, বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ৫টি, বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৬টি, বিএনপি-আওয়ামী লীগ-জামায়াত সংঘর্ষের একটি, বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষের একটি, এনসিপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের একটি এবং জামায়াত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ৩টি ঘটনায় ভাঙচুর হলেও কেউ হতাহত হয়নি।
নারী ও শিশু নির্যাতন
মে মাসে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, এ মাসে ৩২৬ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ জন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১৬ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬ জনকে এবং ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ২৮ জনের ক্ষেত্রে। এছাড়া যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৮ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৩ জন, এসিড সহিংসতার শিকার ৩ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩০ জন। অপহরণ ও নিখোঁজ হয়েছেন ১২ জন, আর হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৯ জন নারী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মে মাসে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার অন্তত ৬টি ঘটনা স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে আপস করা হয়েছে, যা প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করে বেআইনিভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
এমএসএফ মনে করে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এখনও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।






