রেলের ৩০ ইঞ্জিন আসছে, সময় লাগবে সাড়ে ৩ বছর
- যাত্রী ট্রেনের জন্য ট্রেন ইঞ্জিনের জন্য ইঞ্জিন আরেক ট্রেনের বগি থেকে ছাড়া পাওয়ার অপেক্ষায়
- মোট মিটারগেজ ইঞ্জিন আছে ১৬৪টি ১১৫টিই মেয়াদোত্তীর্ণ
- নতুন লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে আসবে ৩০ ইঞ্জিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যাত্রী অপেক্ষা করছেন ট্রেন ছাড়ার। ট্রেন অপেক্ষা করছে ইঞ্জিনের। ইঞ্জিন অপেক্ষা করছে অন্য কোনো ট্রেনের বুক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার! এভাবে জোড়াতালির মধ্যে ট্রেন চালানোর মধ্যেই ‘সুখবরটি’ এলো। ৩০টি ইঞ্জিন আসছে। তারপরও অপেক্ষার প্রহর ফুরাবে কি? কারণ, ইঞ্জিনগুলো আসতে লাগবে সাড়ে তিন বছর— ২০২৯ সালের শেষ দিন পর্যন্ত। এখনই ঘাটতি শতাধিক ইঞ্জিনের। সেখানে আসছে মাত্র ৩০টি। আসতে আসতে ঘাটতি বাড়তেই থাকবে। যাত্রী, ট্রেন বা ইঞ্জিন— কোনোটির অপেক্ষাই ফুরাবে না।
গত বছরের ১৬ আগস্ট ঢাকার কমলাপুরে চট্টলা এক্সপ্রেসের যাত্রীরা এরই উদাহরণ দেখেছেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর ট্রেনটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। কমলাপুরে বিকল্প মিটারগেজ ইঞ্জিন না থাকায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি কনটেইনারবাহী ট্রেনকে নরসিংদীতে থামিয়ে তার ইঞ্জিন খুলে আনা হয় ঢাকায়। সেই ইঞ্জিন চট্টলা এক্সপ্রেসে যুক্ত করার পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে ট্রেনটি চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছাড়ে— নির্ধারিত সময়ের প্রায় পৌনে চার ঘণ্টা পর। অর্থাৎ একটি ট্রেনের যাত্রা শুরু করতে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল আরেকটি ট্রেনকে।
এক বছর পরও পরিস্থিতির খুব একটা বদল হয়নি। গত ২৮ জুন চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড থেকে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর উদ্দেশে যাওয়া একটি মালবাহী ট্রেন হাসানপুর-নাঙ্গলকোট এলাকায় ইঞ্জিন বিকলের পর আটকে পড়ে। বিকল্প ইঞ্জিন না পাওয়ায় সাড়ে ৯ ঘণ্টায় গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা থাকা ট্রেনটির সময় লাগে ৭৫ ঘণ্টা— প্রায় তিন দিন।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনও মিটারগেজ ইঞ্জিন সংকটকে ‘ভয়াবহ’ বলে স্বীকার করেছেন। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ২০১৮ সালে মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও নানা কারণে তা এগোয়নি। ২০২৩ সালের জুনে ৬০টি লোকোমোটিভের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও প্রকল্পটি হাতে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন প্রকল্পটি শুরু হচ্ছে।
শুধু যাত্রীবাহী নয়, ইঞ্জিন সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহনও। রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ২৩ জুলাই— ৫৩ দিনে ৪৯টি মালবাহী ট্রেন ১ হাজার ১৪৭ ঘণ্টা বিলম্বে গন্তব্যে পৌঁছেছে। এর ৪০ শতাংশের বেশি বিলম্ব হয়েছে মালবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে যাত্রীবাহী ট্রেনে ব্যবহারের কারণে। এক ঘটনায় চট্টগ্রামগামী জ্বালানি তেলবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে অন্য ট্রেনে দেওয়ায় সেটি আখাউড়ায় আটকে ছিল ২৯৬ ঘণ্টা— ১২ দিনের বেশি। এই সংকটের মধ্যে গত বুধবার মিটারগেজ রেলের সক্ষমতা বাড়াতে ৩০টি ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কেনার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ‘রেলওয়ের সক্ষমতা সম্প্রসারণ প্রকল্প’ নামের এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রকল্প অনুমোদন হলেও নতুন ইঞ্জিন পেতে রেলকে অপেক্ষা করতে হবে আরও সাড়ে তিন বছর।
রেলওয়ের ১৬৪টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১১৫টি মিটারগেজ ইঞ্জিনের মোট আয়ুষ্কাল পার হয়ে গেছে, যা মোট মিটারগেজ ইঞ্জিনের প্রায় ৭০ শতাংশ। পুরনো এসব ইঞ্জিনের উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও কম নির্ভরযোগ্যতার কারণে হঠাৎ বিকল হলে সচল ইঞ্জিনগুলোর ওপর চাপ বাড়ে; এমনকি বাধ্য হয়ে মালবাহী ট্রেন থেকে ইঞ্জিন সরিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেনে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
ঘন ঘন ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় মালবাহী ট্রেন চলাচল আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালবাহী ট্রেনের ট্রিপ ২ হাজার ৭৭০টি থেকে ১ হাজার ৪৬৭টিতে এবং রেলের আয় ৩৫৪ দশমিক ৪০ কোটি থেকে ১৬৩ দশমিক ৩১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। প্রতিদিন গড়ে ইঞ্জিনের বরাদ্দও ৯ দশমিক ৯১ থেকে ৩ দশমিক ১৪টিতে দাঁড়িয়েছে।
৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের ৬১১ দশমিক ৩৭ কোটি এবং এআইআইবির ঋণ ২ হাজার ১৫৮ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা। আইআইএফসির সমীক্ষা করা প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বৈদেশিক অর্থায়ন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত ১৪ মে পিইসি সভায় প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়।
পুরনো ইঞ্জিন প্রতিস্থাপন, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে ৩০টি নতুন মিটারগেজ ইঞ্জিন সংগ্রহের এই উদ্যোগ। রেলের প্রত্যাশা, এগুলো যুক্ত হলে মিটারগেজের পরিচালনা সংকট কাটবে।
তবে আজ কোনো ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হলে সমাধান ২০২৯ সাল পর্যন্ত থমকে থাকবে না— প্রয়োজন হবে একটি বিকল্প ইঞ্জিনের। আর সেই ইঞ্জিন জোগাড় করতে গিয়ে থামিয়ে দিতে হয় অন্য কোনো ট্রেন বা মালবাহী রেক। অর্থাৎ এক ট্রেনের যাত্রা নিশ্চিত করতে ব্যাহত হচ্ছে অন্য ট্রেনের সময়সূচি। নতুন ৩০টি ইঞ্জিন সংকট সমাধানের যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, রেলের বহরে তা যুক্ত হতেও অপেক্ষা করতে হবে ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো— সংকট যখন এখনই, সমাধান আসতে কেন লাগবে সাড়ে তিন বছর? এর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ১১৫টি ইঞ্জিনের ওপর বাড়তে থাকা চাপ সামলাতে গিয়ে রেলকে আরও কত ট্রেন থামাতে হবে, কত ইঞ্জিন ধার করতে হবে— সেই অপেক্ষার হিসাবই এখন বড়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামছুল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিগত সরকার অবকাঠামো খাতে যতটা মনোযোগী ছিল, পরিচালন খাতে ততটা মনোযোগ দেয়নি। তাই বড় বড় রেললাইন নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু তাতে চলার জন্য পর্যাপ্ত রোলিং স্টক (ইঞ্জিন ও বগি) সংগ্রহ করেনি।’



