ক্যাম্পাসে শক্তি দেখানো থেকেই সংঘাত
- ছাত্রদল-ছাত্রশিবির মুখোমুখি
- আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাই সাম্প্রতিক সংঘর্ষের অন্যতম কারণ
- পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে শিক্ষাঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিক্ষাঙ্গনে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাই ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। হলের নিয়ন্ত্রণ, সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তার ও ক্যাম্পাসে অবস্থান শক্ত করার এ লড়াইকে ঘিরে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখোমুখি হচ্ছেন দুই সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, ধারাবাহিক এসব সংঘর্ষে তা আবারও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ চাইলেও শিক্ষাবিদরা সতর্ক করেছেন, এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে শিক্ষাঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীনের মতে, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেয়েছে। কোনো একটি দল যখন এত বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তখন একধরনের একাধিপত্যের প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইতিহাস বলছে, এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিএনপির ছাত্রসংগঠন হলো ছাত্রদল। দলটি যখন দেখে যে তাদের রাজনৈতিক শক্তি সবচেয়ে বেশি এবং তারা ক্ষমতায় রয়েছে, তখন ছাত্রসংগঠনের মধ্যেও সেই ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।’
গত সোমবার সন্ধ্যায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। উভয়পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে এবং প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল, শিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে ন্যাশনাল মেডিকেলেও গড়ায়। একই দিনে ঢাকা কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসা এলাকায়ও শিবির-ছাত্রদলের সংঘর্ষে আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হলের সিট দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এরই জেরে বিকালে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
শিবিরের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের মতো একক আধিপত্য তৈরির জন্য পরিকল্পিতভাবে হামলা ও সংঘাতের সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে ছাত্রদল বলছে, ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র মহড়া, অনলাইনে জামায়াত ও শিবিরের শীর্ষনেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য এবং সারা দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল এক গণজমায়েতে শিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম অভিযোগ করেন, ‘ক্যাম্পাসে আবারও হল দখল, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের একজন কর্মীও বেঁচে থাকতে কোনো হল বা ক্যাম্পাস সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের দখলে যেতে দেওয়া হবে না এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’
অন্যদিকে ছাত্রদল বলছে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র মহড়া, অনলাইনে জামায়াত ও শিবিরের শীর্ষনেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য এবং সারা দেশে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাও একই পরিকল্পনার অংশ।
সংগঠনটির দাবি, ছাত্রদল সবসময় শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তবে, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, উসকানি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ছাত্রদল অতীতের মতো ভবিষ্যতেও দৃঢ় অবস্থানে থাকবে।
আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সহাবস্থানের যে পরিবেশ ছিল, সেটি হঠাৎ করে সংঘর্ষে রূপ নেওয়ায় শিক্ষার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষকদের কেউ কেউ।
‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে জুলাইয়ের মতো পরিস্থিতি ফিরবে’: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে দায়িত্বশীলদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে, একাধিপত্যের কারণে ভবিষ্যতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তারা।
অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, ‘কোনো ধরনের বাড়াবাড়িই কখনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। যদি বাড়াবাড়ি গ্রহণযোগ্য হতো, তাহলে জুলাইয়ের ঘটনাগুলো ঘটত না। জুলাই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল, তাদের ছাত্রসংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সবারই সতর্ক হওয়া উচিত।’
‘বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এরই মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা অন্যায় বা অতিরিক্ত ক্ষমতার প্রদর্শন অনির্দিষ্টকাল মেনে নেবে না। তাই এ বিষয়গুলোকে যদি গুরুত্ব না দেওয়া হয়; কিংবা উপেক্ষা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও জুলাইয়ের মতো পরিস্থিতি আবার সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না’— যোগ করেন তিনি।






