শরীরে একই ট্যাটু , দুই সহকর্মী জানতেন না বোন হন তারা

দুইবোন টিনেট্টি ও ম্যাডিসন
কানেকটিকাটের দুই তরুণী টিনেট্টি ও ম্যাডিসন। দু'জন বড় হয়েছেন আলাদা দুই পরিবারে। যাপন করেছেন আলাদা জীবন। ভাগ্যের অদ্ভুত এক মোড়ে এসে জীবন তাদেরে কাছে ধীরে ধীরে খুলে দেয় অবিশ্বাস্য এক সত্য। দুজনই ছিলেন দত্তক নেওয়া সন্তান। শৈশবে একে অপরের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানতেন না তারা। অথচ বড় হতে হতে দুই বোন ভাগ্যের পরিক্রমায় বাসস্থান নিলেন মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে। ম্যাডিসনের মনে ছোটবেলা থেকেই ছিল অদ্ভূত এক ধরনের শূন্যতা।
তিনি ভাবতেন, যিনি তাকে জন্ম দিয়েছেন, তার সঙ্গে আদৌ কি কোনো মিল আছে তার? হয়তো হাসি, হয়তো চোখ বা কোনো অদৃশ্য টান। তিনি জানতেন, তার আসল পরিবার ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে এসেছে। দারিদ্র্যের কারণে দত্তক দেওয়া হয়েছিল তাকে। এই ভাবনাই একসময় নিজের শিকড় খোঁজার পথে ঠেলে দেয় তাকে। কিন্তু কোনো জন্মসনদ না থাকায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় বারবার। তবু নিজের শিকড় ভুলে যাননি ম্যাডিসন। ১৯ বছর বয়সে নিজের বাহুতে ডোমিনিকান রিপাবলিকের পতাকার ট্যাটু করান তিনি। তার ভাষায়, 'ডোমিনিকান হওয়া আমার জন্য গর্বের বিষয়।' বছর কয়েক পর একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে জীবনের মোড় ঘুরে যায় তার।
একটি বার-এ কাজ করতে গিয়ে ম্যাডিসনের সঙ্গে পরিচয় হয় সহকর্মী টিনেট্টির। প্রথম আলাপেই টিনেট্টির চোখ আটকে যায় ম্যাডিসনের হাতের ট্যাটুতে। অবাক হয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন যে, তার নিজের শরীরেও পিঠে একই দেশের পতাকার ট্যাটু রয়েছে। কৌতূহল বাড়তে থাকে তার। কথা এগোয়, আর ধীরে ধীরে দুজনই বুঝতে শুরু করেন, অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে তাদের দু'জনের গল্পগুলো । এক পর্যায়ে জানা যায়, দত্তক নেওয়া দুজনই। বেরিয়ে এলো যে, তাদের জন্মস্থানও একই দেশ। 'আমিও ওখান থেকেই দত্তক নেওয়া', হেসে বলেছিলেন টিনেট্টি। তখনই থমকে যান এই দুই সহকর্মী। কৌতূহল থেকে শুরু হয় ছোট্ট একটি প্রশ্নকে ঘিরে যাচাই বাছাই। আশেপাশের মানুষজনকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন তারা, দেখতে কি একরকম লাগে আমাদের? আশেপাশের মানুষও প্রায় একই উত্তর দিত, হ্যাঁ, দেখতে অনেকটা একইরকম আপনারা। একসময় মজা করে নিজেদের বোন বলেও ডাকতে শুরু করেন তারা। কিন্তু সেই মজা একসময় বদলে যায় এক নীরব সন্দেহে। সত্যিই কি তারা আত্মীয়? দত্তকের কাগজপত্র খুঁজেও কোনো মিল পাওয়া যায়নি। জন্মস্থান, মায়ের নাম, সবই আলাদা। ফলে সেই ধারণা থেমে যায় সেখানেই।
আবার দুজনকে দুই পথে টেনে নেয় জীবন। একদিকে টিনেট্টি থেকে যান কানেকটিকাটে। আর ম্যাডিসন চলে যান ভার্জিনিয়ায়। যোগাযোগ থাকলেও দূরত্বে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে এক সময়ের সেই গাঢ় সম্পর্ক । তখন শীতকাল। এক বড়দিনের ছুটিতে উপহার হিসেবে একটি জেনেটিক টেস্ট কিট পান ম্যাডিসন। সেই পরীক্ষাই খুলে দেয় তার জীবনের এক বড় রহস্যের দ্বার। প্রথমে তিনি খুঁজে পান তার দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়কে। তারপর তিনি জানতে পারেন অনেক আগেই মারা গেছেন তার জন্মদাত্রী মা। এরপর ধীরে ধীরে মিলে যায় পুরো পরিবারের সন্ধান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার জন্মদাতা বাবার সঙ্গে যোগাযোগ।
দীর্ঘ আলাপে জানা যায়, দারিদ্র্য আর কঠিন পরিস্থিতির কারণে একসময় পরিবারটি অন্য এক পরিবারের কাছে দত্তক দিতে বাধ্য হয়েছিল তাকে। সব সত্য জানার পর ডোমিনিকান রিপাবলিক যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ম্যাডিসন। বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিল তার আসল পরিবার। সবার গায়ে ছিল তার ছবিসহ টি-শার্ট। বাবাকে দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি ম্যাডিসন। দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেন তারা। পরিবারের সাথে সাক্ষাতের যাত্রাটি ছিল তার জন্য অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা।
ভালো সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন ম্যাডিসন। তবে বাড়ি ফেরার পর গল্পে আসে নতুন মোড়। বাড়ি ফেরার পর মলি নামের এক নারীর সঙ্গে যোগাযোগ হয় তারা। তিনি জানান, ছোটবেলায় টিনেট্টির খুব কাছের বন্ধু ছিলেন মলি। তার দাবি ছিল, ম্যাডিসন আর টিনেট্টি আসলে বোন। কারণ হিসেবে তিনি জানান, তাদের জন্মদাত্রী মায়ের নাম নথিতে একই। যদিও পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, জন্মসনদে ছিল ভুল তথ্য। সরাসরি বোন নন তারা। তবে একই পরিবারের রক্তের সম্পর্ক আছে তাদের মধ্যে। এই সত্য সামনে আসার পর আর দেরি করেননি ম্যাডিসন। বরফঝড়ের মধ্যে আট ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে টিনেট্টির কাছে পৌঁছে যান তিনি। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। ডিএনএ পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন তারা।
আড়াই সপ্তাহ পর যখন ফল আসে, সেই কাঙ্ক্ষিত রিপোর্ট খোলেন টিনেট্টি। শুধু একটি লাইনেই বদলে যায় সবকিছু। 'আপনারা দুইজন বোন।' সেই মুহূর্তে সময় যেন থেমে গিয়েছিল দুজনের জন্যই।
'অবিশ্বাস্য খবর এটি।' বলেছিলেন টিনেট্টি। 'এতদিন ধরে একসঙ্গে ছিলাম আমরা। অথচ জানতামই না সম্পর্কে একেঅন্যের বোন হই আমরা।' ম্যাডিসনের চোখে তখন শুধু কান্না। খবর পৌঁছে যায় তাদের বাবার কাছে। আনন্দে ভেসে যান তিনি।
দুই বোন একসাথে এরপর আবার যান ডোমিনিকান রিপাবলিকে। এবার অপেক্ষা করছিল তাদের নতুন এক পুনর্মিলন। তাদের পরিবার যেন পূর্ণতা পেল এবার। সেখানে পৌঁছে আবারও একই দৃশ্য। সবাই অপেক্ষা করছেন তাদের জন্য। এবার একজনের জায়গায় দুই বোনের মুখ ছাপানো শার্ট চাপানো তাদের গায়ে। বাবা এগিয়ে এসে টিনেট্টিকে জড়িয়ে ধরে বলেন, 'আমার মেয়ে।' সেই মুহূর্তেই সব হারানো সময় যেন ফিরে এসেছিল এই আলিঙ্গনের মধ্যে। আজ তাদের গল্প শুধু এক পারিবারিক পুনর্মিলন নয়, এটা এমন এক সম্পর্কের গল্প, ভাগ্য নিজের মতো করে লিখেছিল যা। আর সময় শুধু অপেক্ষা করছিল সেই আবেগঘন গল্প প্রকাশ হওয়ার।







