এলডিসিতে সময় বাড়লেও আছে নতুন চ্যালেঞ্জ

সংগৃহীত ছবি
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। ফলে পূর্বনির্ধারিত ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটাবে। নিউ ইয়র্কে সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে এ প্রস্তাবটি উত্থাপন করে উরুগুয়ে। এতে করে দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হলেও, বিষয়টিকে কোনো জাতীয় সাফল্য হিসেবে উদযাপন না করে কাঠামোগত সংস্কারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
জাতিসংঘ গৃহীত প্রস্তাবে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বাংলাদেশকে অতিরিক্ত তিন বছর সময় দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া যায়। প্রস্তাবনায় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ এবং প্রতি বছর জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২০২১ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে পাঁচ বছরের সময় দিয়েছিল, যা ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কভিড-১৯ পরবর্তী ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে বাংলাদেশ অতিরিক্ত সময়ের আবেদন করে। একই অধিবেশনে প্রতিবেশী দেশ নেপালের উত্তরণ প্রস্তুতিকালও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশ জুড়ে রয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প। এলডিসি উত্তরণের ফলে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ইবিএ স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ জিরো-ডিউটি সুবিধা পাচ্ছে। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে এই সুবিধা বজায় রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা ধরে রাখার শর্তাবলি পূরণ করা এবং ভারত, চীন, জাপান ও আশিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা সার্বিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষর করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলছেন, এ সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য যেমন অতিরিক্ত সময়ের সুযোগ দিয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের অপূর্ণতাকেও সামনে এনেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ ও ব্যাংক খাতের অনিয়ম কাটিয়ে উঠতে না পারলে ২০২৯ সালও কোনো জাদুকরী সমাধান আনবে না। আগামী তিন বছরে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।
বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সময়মতো পরিস্থিতি অনুধাবন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সম্মিলিত টিমওয়ার্কের মাধ্যমে যে ফলাফল অর্জন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এলডিসি উত্তরণ মানেই সব দেশ থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, কারণ এই সুবিধাগুলো মূলত বিভিন্ন দেশের নিজস্ব স্কিম ও নীতিমালার ওপর নির্ভর করে। তাই এই বাড়তি তিন বছরের সময়কে শুধু একটি সাময়িক স্বস্তি বা আত্মতুষ্টির সুযোগ হিসেবে না দেখে এটিকে একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য এই সময়ের মধ্যেই দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার বা টিকিয়ে রাখার শর্তগুলো পূরণের অংশ হিসেবে এখনই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনয়ন এবং পরনির্ভরশীলতা কমানোর কাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে শুরু করতে হবে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার জন্য শুধু নিজেদের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; বরং প্রধান বড় বাজারগুলোতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের কাজগুলোও এই সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এই তিন বছর পার হয়ে গেলে ভবিষ্যতে অত্যন্ত কঠিন সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে, যা এড়াতে এখনই সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বাংলাদেশকে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের জন্য তিন বছরের সময় বৃদ্ধি বা পিছিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বলছেন, আমাদের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য এটি কর্মসংস্থান রক্ষা করা, প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং একটি টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার মতো মূল্যবান সুযোগ বা সময় তৈরি করে দেবে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে আমরা এই তিন বছরের মধ্যে কী অর্জন করতে পারছি তার ওপর।
তিনি বলেছেন, এই তিন বছরের অতিরিক্ত সময় তৈরি পোশাক খাতকে তাদের সক্ষমতা জোরদার করতে, কারখানাগুলো আধুনিকায়ন করতে এবং কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার) ও উচ্চমূল্যের পোশাকের দিকে বৈচিত্র্য আনতে অত্যন্ত মূল্যবান সময় উপহার দেবে। একই সঙ্গে এটি বিনিয়োগ এবং বিদেশি ক্রেতাদের কেনাকাটা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বেশি অনিশ্চয়তাহীন ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ তৈরি করবে।
অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও নীতি-বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর-পরবর্তী সময় মসৃণ রাখতে বাংলাদেশকে এখনই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং নিম্নমুখী কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদার করা আবশ্যক। অবকাঠামোগত দিক থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরসহ প্রধান সরবরাহ শৃঙ্খল ও লজিস্টিকস খাতের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া শিল্পে অটোমেশন ও প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং ব্যবসা সহজীকরণের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা প্রয়োজন। জাতিসংঘের দেওয়া এই তিন বছরের অতিরিক্ত সময়সীমা মূলত আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ দেয় না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো একটি শক্তিশালী টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার শেষ সুযোগ তৈরি করে দেয়।



