সরকারি কর্মচারীদের বার্ষিক পরিসংখ্যান
প্রশাসনে মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বে ৩৩২ নারী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি চাকরিতে বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সবশেষ তথ্য বলছে, মোট সরকারি চাকরিজীবীর মধ্যে ২৯ শতাংশ নারী। পাঁচ বছর আগেও যা ছিল ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ বছরে সরকারি চাকরিতে নারী কর্মী বেড়েছে ৩ শতাংশ।
সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংস্কার ও গবেষণা অনুবিভাগ দেশের সবশেষ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিসংখ্যান প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। যেখানে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে। ‘স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফ-২০২৫’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি দু-এক দিনের মধ্যেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। যেখানে থাকা তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০। এর মধ্যে ৪ লাখ ২১ হাজার ৭৮৮ জন নারী, যা মোট চাকরিজীবীর প্রায় ২৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনটির তথ্য বলছে, ২০২১ সালে মোট চাকরিজীবীর মধ্যে নারী ছিলেন ২৬ শতাংশ। মাঝে সামান্য বেড়ে-কমে সবশেষ এই হার ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু পরিসংখ্যানটি এখনো প্রকাশ হয়নি, তাই বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। তবে একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, পরিসংখ্যান সংক্রান্ত বইটি ছাপাখানায় গেছে। আজ বুধবার বা আগামীকাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এটি পাওয়া যাবে।
তবে প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী ও মাঠপ্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে বলে জানাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি সূত্র। তাদের তথ্যমতে, এ মুহূর্তে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ৮৭টি সচিব বা সচিব-সমমর্যাদার পদের মধ্যে ১৭টিতে নারী কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। ৬৪ জন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মধ্যে ২১ জন নারী কর্মকর্তা রয়েছেন। এ ছাড়া প্রশাসনে ৩৫০ জন অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে ৭০ জন এবং ১ হাজার ২১ জন যুগ্ম সচিবের মধ্যে ২৪৬ জন নারী। ১ হাজার ৪৮০ জন উপসচিবের মধ্যে ৩৭২ জন এবং ৩ হাজার ৩৫০ জন সহকারী ও সিনিয়র সহকারী সচিবের মধ্যে ৯৮৬ জন নারী কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বর্তমানে দেশের ৪৯৯টি উপজেলার মধ্যে ১৯১টিতে দায়িত্ব পালন করছেন নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। অর্থাৎ প্রায় ৩৯ শতাংশ উপজেলায় প্রশাসনের নেতৃত্বে রয়েছেন নারী কর্মকর্তা। ভূমি প্রশাসনেও নারীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে ৪৭৮ জন সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর মধ্যে ১১৬ জন নারী, যা মোট পদের ২৪ শতাংশের বেশি। সব মিলিয়ে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ১ হাজার ৮৫টি পদের মধ্যে ৩৩২টিতে নারী কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ মাঠ প্রশাসনের প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদে এখন কাজ করছেন নারীরা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, প্রথম শ্রেণির মোট চাকরিজীবী আছেন ২ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ জন। এর মধ্যে নারী কর্মকর্তা ৪৬ হাজার ৯৪৫ জন। দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিজীবীদের মধ্যে নারীর হার অন্য শ্রেণির তুলনায় একটু বেশি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ৩৬ শতাংশেরও বেশি নারী চাকরিজীবী আছেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২ লাখ ৪০ হাজার চাকরিজীবীর মধ্যে ৮৬ হাজার ৯৯৮ জনই নারী। তৃতীয় শ্রেণিতে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৩১৮ জন চাকরিজীবীর মধ্যে ২ লাখ ২৬ হাজার ৫১৭ জনই নারী। অন্যদিকে চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে নারী আছেন ১৬ শতাংশের সামান্য বেশি।
যেসব মন্ত্রণালয়ে নারী সচিব: এ মুহূর্তে ১৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নারী কর্মকর্তারা সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তারা হলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নাজমা মোবারেক, পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) নাসরীন জাহান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মাহবুবা ফারজানা, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কানিজ মওলা, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের বিলকিস জাহান রিমি, পরিকল্পনা কমিশন শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ফাহমিদা আখতার, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইয়াসমীন পারভীন, বিদ্যুৎ বিভাগের মিরানা মাহরুখ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সংস্কার ও সমন্বয়) ফারাহ শাম্মী, জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (সচিব) ড. রওশন আরা বেগম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জেসমিন নাহার এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম। এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত সচিব আছেন ইসরাত চৌধুরী, ফারজানা মমতাজ ও জাহেদা পারভীন।
যেসব জেলার ডিসি নারী: প্রশাসনে আগের সব রেকর্ড ভেঙে বর্তমানে ৬৪ জেলার মধ্যে ২১ জেলার দায়িত্ব সামাল দিচ্ছেন নারী জেলা প্রশাসক (ডিসি)। মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ পদে একসঙ্গে এত বেশিসংখ্যক নারী এর আগে কখনো দায়িত্ব পালন করেননি। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনের সর্বোচ্চ ১৮ জন নারী ডিসি দায়িত্বে ছিলেন। যদিও আট বিভাগীয় কমিশনারের মধ্যে একজনও নারী নেই। নারী ডিসিরা হলেন ঢাকায় ফরিদা খানম, মুন্সীগঞ্জে সৈয়দা নূরমহল আশরাফী, নরসিংদীতে ইসরাত জাহান কেয়া, মানিকগঞ্জে নাজমুন আরা সুলতানা, কিশোরগঞ্জে সোহানা নাসরিন, টাঙ্গাইলে শরিফা হক, রাজবাড়ীতে আফরোজা পারভীন, শরীয়তপুরে তাহসিনা বেগম, মাদারীপুরে মর্জিনা আক্তার ও কুমিল্লায় রোজী আক্তার। এ ছাড়া আরও রয়েছেন রাঙামাটিতে নাজমা আশরাফী, ফেনীতে মনিরা হক, নাটোরে আসমা শাহীন, খুলনায় হুরে জান্নাত, সাতক্ষীরায় কাউসার আজিজ, চুয়াডাঙ্গায় লুৎফুন নাহার, মেহেরপুরে শিল্পী রানী রায়, বরগুনায় তাছলিমা আক্তার, কুড়িগ্রামে অন্নপূর্ণা দেবনাথ, পঞ্চগড়ে মোছা. শুকরিয়া পারভীন এবং শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে নারী ডিসির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বিভাগের ১৩ জেলার মধ্যে ৯ জেলায় নারী ডিসি দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে চারজন, চট্টগ্রাম বিভাগে তিনজন, রংপুর বিভাগে দুজন এবং রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে একজন করে নারী ডিসি রয়েছেন। শুধু জেলা প্রশাসনেই নয়, উপজেলা প্রশাসনেও নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।
ঢাকা জেলার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম আগামীর সময়কে বললেন, ‘বর্তমান সরকার নারীদের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক। নারীদের কীভাবে সম্মান দিতে হয় সরকারপ্রধানের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান দেখলেই বোঝা যায়। কেন্দ্রীয় ও মাঠ প্রশাসনে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা অতীতে কখনো এত বেশি ছিল না।’ নারীরা কর্মক্ষেত্রে তাদের সততা ও দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলছিলেন, ‘সরকারও প্রশাসনে নারী-পুরুষের সমতা আনার চেষ্টা করছে। ডিসি ও ইউএনওর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া শুধু সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়। এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে নারী কর্মকর্তাদের দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের বাস্তব প্রতিফলন। এটিই হবে আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশ।’




