রয়টার্সের প্রতিবেদনে দাবি
টিকাদানের ঘাটতিতেই হামের প্রকোপ
- রাজনৈতিক অস্থিরতা স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট টিকা কেনার আদেশে বিলম্ব হওয়ায় টিকাদানে ঘাটতি
- ২০২৫ সালে প্রথম ডোজের টিকাদান ৯০% দ্বিতীয় ডোজ ৮৬%

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হামে আক্রান্ত দুই বছরের ছেলে আরমান হোসেনকে বাঁচাতে নিজের তিন চাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিক্রি করে দিয়েছিলেন বাবা আমিন মিয়া। ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু হয়। ছেলেকে দাফন করার পর গ্রামে এসেছিলেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। অথচ তার আগেই শিশুটিকে টিকা দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে হয়তো এড়ানো যেত এমন করুণ পরিণতি।
সিলেটের প্রত্যন্ত এলাকার এ ঘটনা বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতির একটি বড় দুর্বলতা সামনে এনেছে বলে দাবি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ হচ্ছে— টিকাদানের সুযোগ থেকে শিশুদের বাদ পড়ে যাওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘাটতি, দুর্বল তথ্য ব্যবস্থা এবং জরুরি কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রস্তুতির অভাবেই হাম প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে বাংলাদেশে। শুধু তাই নয়; বাংলাদেশের হামের পরিস্থিতি বিশ্বের অন্য দেশের জন্যও সতর্কবার্তা বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ ২ হাজার মানুষের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে, প্রায় ২২ হাজার মানুষের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৪৭ জন। এসব মৃত্যুর ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ডব্লিউএইচওর নথিপত্র পর্যালোচনা এবং এক ডজনের বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়ে বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধান করেছে। এতে নিয়মিত টিকাদানে পিছিয়ে পড়া, জরুরি কর্মসূচির প্রস্তুতিতে ঘাটতি এবং বিপুলসংখ্যক শিশুকে শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনতে না পারার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
হাম প্রতিরোধে শিশুদের টিকার দুটি ডোজ প্রয়োজন। ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী, রোগটির বিস্তার ঠেকাতে জনসংখ্যার অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সম্প্রতি সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ডব্লিউএইচও ও জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজ নেওয়ার হার ছিল ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে প্রথম ডোজ নেওয়ার হার কমে ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু রোগটির ঝুঁকিতে থেকে যায়।
২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, টিকা কেনার আদেশ দিতে বিলম্ব এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সময়ে টিকাদানসংক্রান্ত সরকারি তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৫ সাল পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়া শিশুর সংখ্যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি দেখানো হয়েছিল। এতে টিকা নেওয়া শিশুর প্রকৃত সংখ্যা কিংবা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল থাকার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিল ও মে মাসে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেয় সরকার। শুরুতে নতুন রোগীর সংখ্যা কমতে থাকায় কর্মসূচিটি সফল হচ্ছে বলে ধারণা তৈরি হয়। সরকারও দাবি করেছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী তথ্য সেই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরে। জুন মাসে পরিচালিত আরেকটি নিয়মিত স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে একই বয়সী শিশুদের যে তালিকা পাওয়া যায়, তাতে জরুরি হামের টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪০ লাখ বেশি শিশুর নাম ছিল। অর্থাৎ, জরুরি কর্মসূচির হিসাবের বাইরে থেকে যাওয়া শিশুদের সংখ্যা ছিল বিপুল।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা সরকারি ও স্বাস্থ্য সহযোগী সংস্থাগুলোর বৈঠকের কার্যবিবরণীতে প্রস্তুতির ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। ১৯ এপ্রিলের এক বৈঠকে বলা হয়, সময় স্বল্পতার কারণে জরুরি কর্মসূচি শুরুর আগে সাধারণত চার দফায় প্রস্তুতি যাচাই করার পরিবর্তে মাত্র এক দফা যাচাই করা হয়। সেখানে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলা প্রস্তুত থাকলেও সব জেলার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি।
দুর্গম এলাকার শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে
সিলেটের ছাতকে ৯ মাস বয়সী লাবিবা আক্তারের মৃত্যুও টিকাদানের সুযোগ ও তথ্য পৌঁছানোর ঘাটতি সামনে এসেছে। গত জুনে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুটির মৃত্যু হয়। গত এপ্রিলে জরুরি কর্মসূচিতে টিকা দেওয়ার বয়সসীমা ছয় মাসে নামিয়ে আনা হয়েছিল। সে অনুযায়ী, লাবিবারও টিকা পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তার বাবা হুমায়ুন রশিদ জানিয়েছেন, কর্মসূচির খবর জানাতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী তাদের কাছে যাননি।
বাংলাদেশের হাম ও রুবেলা নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারীবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বললেন, প্রস্তুতি যাচাই যথাযথ না হলে সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুরাই সাধারণত টিকা থেকে বাদ পড়ে। শেষ পর্যন্ত তাদেরই এর মূল্য দিতে হয়।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি এক হাজার হামের রোগীর মধ্যে দু-তিনজনের মৃত্যু হতে পারে। তবে অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগটি আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
হামে রোগী আবার বাড়তে থাকায় আগে টিকা থেকে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নতুন কর্মসূচি শুরু করে সরকার। তবে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শিশুর জন্মনিবন্ধন হয় না। অন্যদিকে, সরকারি তথ্য বলছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য রয়েছে।
ডব্লিউএইচওর উপপ্রতিনিধি রাজেশ নারওয়াল বলেছেন, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারকে সহায়তা দিতে সংস্থাটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘাটতি এড়াতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই বয়সী শিশু।
নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও ডব্লিউএইচওর টিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিটের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর চেয়ে নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করা সহজ, কম ব্যয়বহুল ও নিরাপদ।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বললেন, ইপিআইয়ের নিয়মিত মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের তথ্য সংগ্রহ, অভিভাবকদের টিকা দেওয়ার উদ্বুদ্ধ করা। টিকাদান কর্মসূচিতে সময়ের অভাবে শুরুতে এই পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়নি। টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে হলে প্রতিটি এলাকার শিশুদের সঠিক তালিকা তৈরি, প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিকল্পিতভাবে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।



