‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে লাগবে অনুমতি
- মন্ত্রিসভায় উঠছে মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া

অন্তর্বর্তী সরকারের করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। প্রস্তাবিত খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ‘গোপন আয়নাঘর’ (আটককেন্দ্র) বা যেকোনো আটককেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারবেন না মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। অধ্যাদেশে অনুমতি ছাড়াই গোপন আয়নাঘর বা আটককেন্দ্র পরিদর্শনের বিধান ছিল। এ ছাড়া অধ্যাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ‘ওপরের নির্দেশ’বলে অপরাধ থেকে দায়মুক্তি না পাওয়ার বিধানও রাখা হয়নি। এ ছাড়া জাতিসংঘের ‘নির্যাতনবিরোধী সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল’ অনুযায়ী হেফাজতে নির্যাতন, মৃত্যু বা গুমরোধকল্পে ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউনিট; (এনপিআই) নামে নতুন একটি ইউনিট প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত খসড়াটি অনুমোদনের জন্য আজ সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে। প্রস্তাবিত খসড়ায় কমিশন গঠন ও মেয়াদকালের সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ ও প্রস্তাবিত আইনের খসড়া পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধ্যাদেশের ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে অজুহাত অগ্রহণযোগ্য’ শিরোনামে ধারা-১৫ বাদ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘সংবিধান বা বলবৎ কোনো আইন দ্বারা স্পষ্টভাবে সমর্থিত না হইলে, কেবল সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশ মোতাবেক করা হইয়াছে, এইরূপ অজুহাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় হইতে রেহাই পাওয়া যাইবে না।’
কমিশনের কার্যাবলির (ক)-তে বলা হয়েছিল, কোনো রাষ্ট্রীয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বা অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের প্ররোচনা-সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পক্ষে দাখিলকৃত আবেদনের ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও ক্ষেত্রমতো তদন্ত করতে পারবে। এ ছাড়া (ঝ)-তে বলা হয়েছিল— ‘কারাগার ও হাজতখানাসহ যেকোনো আটককেন্দ্র, নিরাপত্তা হেফাজত, শিশু উন্নয়নকেন্দ্র কিংবা চিকিৎসা বা ভিন্নরূপ কল্যাণার্থে মানুষকে অন্তরীণ রাখা হয়— এমন কোনো স্থানের বাসিন্দাদের বসবাসের অবস্থা পরিদর্শন করা এবং এরূপ স্থান ও অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করবে।’
এর বদলে প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তপূর্বক প্রাথমিক সত্যতা উদঘাটন এবং এই আইনের অধীনে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তকালে বা পরবর্তী সময়ে যেকোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে যেকোনো স্থান, অফিস-আদালত, হাজতখানা ও আটককেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারবে।
অধ্যাদেশে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিতে চার সদস্যের কমিশনারের মধ্যে দুজন পুরুষ ও দুজন নারী রাখার বিধান ছিল। প্রস্তাবিত খসড়ায় সেটি তুলে দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারককে। প্রস্তাবিত খসড়ায় বাছাই কমিটির সভাপতি প্রস্তাব করা হয়েছে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে। এ ছাড়া বাছাই কমিটিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি বা তার মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি রাখার বিধানটিও প্রস্তাবিত খসড়ায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশে কমিশনের অনুসন্ধান চলাকালে অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা প্রসঙ্গে ছিল, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালে কমিশন ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে যেকোনো আইনানুগ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে বা নির্দেশ দিতে পারবে।’ এর বদলে প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা ইহার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের নিকট প্রতিবেদন চাইতে পারবে। প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হলে আর কোনো উদ্যোগ নিতে পারবে না। সন্তুষ্ট না হলে কমিশন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করতে পারবে।’
খসড়ার ৩৩ ধারায় ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউনিট’ (এনপিআই) নামে নতুন একটি ইউনিট প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের চেয়ারপারসনই ইউনিটের প্রধান হবেন। একজন কমিশনার ও একজন মানবাধিকার কর্মী এই ইউনিটের সদস্য হবেন। এই ইউনিটের সদস্যরা কারাগার, হাজতখানা, শিশু উন্নয়নকেন্দ্র, থানা, অভিবাসনকেন্দ্র, আটক ব্যক্তিদের পরিবহন যান, মানসিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, সেফ হোম বা পরিচর্যাকেন্দ্রসহ ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকুচিত করা স্থানে পূর্বঘোষণা ছাড়াই পরিদর্শন করতে পারবেন।




