বগুড়া-সিরাজগঞ্জ নতুন রেললাইন
পরামর্শ নিতেই খরচ হবে ২৩১ কোটি টাকা!
- পিইসি সভায় উঠছে কাল
- ভারতের পরিবর্তে ঋণ নেওয়া হচ্ছে এআইআইবি থেকে
- বদলে যাচ্ছে প্রকল্পের নাম
- বাড়ছে মেয়াদ ও ব্যয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নতুন একটি রেলপথ তৈরি হবে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত। এটি বাস্তবায়নে পরামর্শ নিতেই বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৩১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। কেন এত বেশি টাকা খরচ করে পরামর্শক লাগবে তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবর্তন হচ্ছে বৈদেশিক ঋণের উৎস এবং প্রকল্পের নাম। সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ‘বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ’ প্রকল্পে ঘটেছে এমন ঘটনা।
দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকার পর নেওয়া হয়েছে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনীর উদ্যোগ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার এ সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত হবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা।
রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সম্মেলন কক্ষে হবে এই সভা। সভায় পরামর্শকের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে যাচ্ছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল অনুমোদনের সময় পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এখন সেখান থেকে ১৬৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৩১ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন বলছে, পরামর্শকসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে পিইসি সভায় আলোচনা করা হবে। সেখানে এটিসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় কমানোর সুপারিশ দেওয়া হতে পারে।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. আবু জাফর মিয়া আগামীর সময়কে বলেছেন, বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ উন্নয়নসহযোগীদের স্ট্যান্ডার্ড মেনে পরামর্শক খাতে এই টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। কারণ আমরা চাই মানের ক্ষেত্রে যাতে কোনো কমতি না হয়। তবে কাল পিইসি সভায় আলোচনা হবে। এরপর এই খাতের ব্যয় পর্যালোচনা করে যতটা কমানো যায় তা কমানো হবে। ইতোমধ্যেই এআইআইবির সঙ্গেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আশা করছি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়েই আসবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ভারতীয় ঋণের পরিবর্তে আমরা এশিয়ান ইনফ্রাসস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট (এআইআইবি) থেকে ঋণ কনফার্ম করেছি। ওই ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি রয়েছে চূড়ান্ত পর্যায়ে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ২ হাজার ৪৩৩ কোটি ১০ লাখ এবং ইন্ডিয়া লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ঋণ থেকে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এরপর বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারি অংশে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৫ হাজার ৯০২ কোটি ৮৭ কোটি টাকা। এবার প্রথম সংশোধনীতে ভারতীয় ঋণ বাদ দিয়ে এআইআইবির ঋণে প্রকল্প ব্যয় ৬ হাজার ৬২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২ হাজার ৫২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৩ হাজার ৮১৩ কোটি ৭০ লাখ এবং এআইআইবির ঋণ ৮ হাজার ৭১০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যয় বাড়বে ৫২ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
এদিকে প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। পরে দফায় দফায় তিন বছর বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এখন প্রথম সংশোধনীতে সাড়ে চার বছর বাড়িয়ে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শুরু থেকে গত মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় খরচ হয়েছে ২ হাজার ২৭১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। এছাড়া ভৌত অগ্রগতি ২৭ দশমিক ৭১ শতাংশ হয়েছে।
প্রকল্পের নাম ও অর্থায়নের পদ্ধতি পরিবর্তন
মূল ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অর্থায়নের উৎস হিসেবে ভারতীয় এলওসি-৩ রাখা হয়েছিল। ওই অর্থায়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিশদ নকশা ও খসড়া দরপত্র নথি তৈরি করে। এছাড়া বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অনুকূলে ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ পরিশোধ করা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত এলওসি পর্যালোচনা সভার ২৩তম বৈঠকে ভারত সরকার প্রকল্পটিকে এলওসি-৩ কাঠামো থেকে বাদ দেয়। ইতোমধ্যে এআইআইবি এই প্রকল্পে একক অর্থায়নকারী হিসেবে অর্থায়নের আগ্রহ দেখায়। ফলেএ ব্যাংক থেকেই ঋণ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে গত ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ৪র্থ পিআইসি সভার সিদ্ধান্তে প্রকল্পের শিরোনাম পরিবর্তন করা হয়েছে। মূল ডিপিপিতে প্রকল্পের নাম ছিল ‘বগুড়া থেকে শহীদ এম. মনসুর আলী স্টেশন, সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ’। বর্তমানে নতুন শিরোনাম হলো ‘বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ’।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় পক্ষই যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারতের ঋণটি বাতিল করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছিল ফলে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমরাও দেখলাম বিকল্প অর্থায়নের পথ যেহেতু আছেই তাহলে তাদের ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম
প্রকল্পের আওতায় ৮৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (করতোয়া নদীর উপর ২৪৬ মিটার দৈর্ঘ্যের ১টি সেতু ও ইছামতি নদীর উপর ২০৫ মিটার দৈর্ঘ্যের ১টি সেতু) তৈরি, অন্যান্য ছোট-মাঝারি ১২১টি সেতু নির্মাণ, ঢাকা-রংপুর হাইওয়ের উপর একটি রেল ওভারপাস নির্মাণ (১৭৮.৩ মিটার) এবং বগুড়া-নাটোর হাইওয়ের উপর একটি রোড ওভারপাস নির্মাণ (১৩৩৫ মিটার) করা হবে। ৮টি নতুন স্টেশন নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম করা হবে বাস্তবায়ন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা
গত ১৬ জুন রেল পরিবহন ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে হয় একটি সভা। সেখানে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, প্রকল্পের আওতায় ডুয়েলগেজ সিংগেল লাইন নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান বগুড়া রেল স্টেশন ও কাহালু-গাবতলী রেললাইন চালু রাখতে হবে। এছাড়া বগুড়া শহরে যানজট নিরসনে সম্ভাব্যতা যাচাই সাপেক্ষে স্বল্প দূরত্বের রেল ক্রসিংগুলো যেমন রাজারবাগ, থানা মোড় ও সেলিম হোটেল রেল ক্রসিং-এ সমন্বিত করে ওভারপাস বা আন্ডার পাস নির্মাণ করতে হবে।




