গ্যাস-বিদ্যুতে বিপর্যয় ছিল অবধারিত
- জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের ভুল নীতির খেসারত গুনতে হচ্ছে এখন
- সংকট কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে সরকার
- আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরামর্শ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গ্যাস-বিদ্যুৎসংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত, স্থবির শিল্পকারখানার উৎপাদন, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন। বর্তমান চিত্রটি কোনো আকস্মিক দুর্যোগের ফল নয়। বরং জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের ভুল নীতি, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, নিজস্ব খনিজ অনুসন্ধানে চরম অবহেলা আর ঝুঁকিপূর্ণ আমদানিনির্ভরতার কারণে এ-সংকট ছিল এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
বিশেষজ্ঞদের ধারাবাহিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গত দেড় দশকে দেশে জ্বালানি খাতের যে ‘উন্নয়ন মডেল’ দাঁড় করানো হয়েছিল, তার ভিত এতটাই নড়বড়ে যে, এখন সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ মাটির নিচে ফেলে রেখে বিপুল মূল্যের বিদেশি জ্বালানির ওপর দেশীয় অর্থনীতিকে জিম্মি করার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের দাবি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে আওয়ামী লীগ সরকার টেকসই উন্নয়ন করেনি। তাই এলএনজির একটা টার্মিনাল বন্ধে সারা দেশে গ্যাসের হাহাকার পড়ে গেছে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা চেপেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এ-সংকট উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি-সংকট সমাধানে কাজ করছে সরকার।
দেশে ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতারও ৯ শতাংশের উৎস আমদানি। প্রায় একটি এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জেরে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে গ্যাসসংকটের পাশাপাশি বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। দেশ জুড়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছাড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। তীব্র লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্যুৎকর্মীদের ওপর ও স্থাপনায় হামলা এবং অফিস ঘেরাওয়ের মতো ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার থেকে সরকার শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে। এতে লোডশেডিং কমলেও কারখানায় গ্যাসের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। বহু কারখানা বন্ধের পাশাপাশি ব্যাহত হয়েছে উৎপাদন। বেড়েছে ব্যয়।
গ্যাসসংকটের আভাস পেয়ে ২০১০ সাল থেকে বাসাবাড়িতে নতুন সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিল্পেও গ্যাস সরবরাহ এবং সংযোগ করা হয় সংকুচিত। অন্যদিকে অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ২০১৬ সাল থেকে গ্যাস উৎপাদন ক্রমেই কমতে থাকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট উৎপাদন ছিল ৯৭২ বিলিয়ন ঘনফুট। এরপর থেকে উৎপাদন কমতে কমতে এখন ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমেছে। এখন প্রতি বছর গ্যাসের উৎপাদন কমছে গড়ে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট। সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় এক খাতে গ্যাস দিতে গেলে অন্য খাতে সংকট তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং তার সহযোগীদের কমিশন বাণিজ্যের জন্য অনুসন্ধান চেয়ে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানিতেই নজর দেওয়া হয় বেশি।
দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। তখন দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ছিল ৯৬৫ বিলিয়ন ঘনফুট। আর এলএনজি আমদানি হয় ১১৬ বিলিয়ন ঘনফুট। সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ৬৯৬ বিলিয়ন ঘনফুট আর আমদানি বেড়ে ২৮২ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন কমেছে আরও। বিপরীতে বেড়েছে এলএনজি আমদানি। অন্যদিকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয় ২০১৩ সাল থেকে। সেই আমদানিও বেড়েছে ধীরে ধীরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিলে এখনকার মতো এত বেশি গ্যাসসংকট হয়তো হতো না। বিশেষ করে, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা জয়ের এক যুগ পরও গ্যাস অনুসন্ধানে শুরু হয়নি কোনো কার্যক্রম। অথচ মিয়ানমার ও ভারত তাদের অংশে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস উত্তোলন শুরু করে দিয়েছে বেশ আগেই।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে মাত্রাতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে নিয়মিত। এই খাতে বকেয়া জমেছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা পাবে বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকরা। ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে।
অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কারণে প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকে বেশিরভাগ সময়। কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাদের নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে গিয়ে ১৫ বছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, বর্তমান সরকার বিদ্যুতের দাম যে হারে বাড়িয়েছে, তাতে নতুন করে আর বকেয়া পড়বে না। কিন্তু পুরনো বকেয়া পরিশোধ করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থেরও সংকট।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুতের এই বিপর্যয় কিন্তু কোনো নিছক কারিগরি সমস্যা নয়। আগের সরকারের ভুল পরিকল্পনা, অনিয়ম ও লুটপাটের ফলে এ-সংকট অবশ্যম্ভাবী ছিল। জ্বালানি খাতের সার্বিক ভিত্তি মজবুত থাকলে একটিমাত্র এফএসআরইউ বিকল হওয়ার কারণে পুরো দেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত এভাবে ভেঙে পড়ত না।’
তিনি বলেছেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের নীতিগত ও কৌশলগত জ্বালানি অনিশ্চয়তার শিকার। এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য টেকসই কোনো নীতি বা কৌশল গ্রহণই করা হয়নি। বরং যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা এ খাতের পতন, লোকসান এবং বকেয়া সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তীব্র রূপ নিয়েছে এবং বিদ্যুৎ খাতে লক্ষাধিক কোটি টাকার ঋণের বোঝা চেপে বসেছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে একটি বিশেষ অলিগার্ক গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে গিয়ে পুরো খাত তছনছ করা হয়েছে।
সমাধান কী, তা জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বললেন, দেড়-দুই দশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের বিভিন্ন স্তরে যেসব লুণ্ঠনমূলক, অন্যায্য ও অসংগত ব্যয় যুক্ত করা হয়েছে, তা অবিলম্বে পর্যালোচনা করে ছেঁটে ফেলতে হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা অনায়াসে সাশ্রয় করা সম্ভব, যা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই বাস্তবায়ন করা যায়। এটি বাস্তবায়িত হলে সরকারকে আর নতুন করে ভর্তুকি দিতে হবে না। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় গ্যাসের ব্যবহার সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। এলএনজি আমদানি কোনোভাবেই এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের ওপরে বাড়ানো যাবে না। ব্যয়বহুল ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করলে ৪২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা দিয়ে বছরে দুই কোটি টন কয়লা আমদানি করা যাবে। এতে তুলনামূলক কম দামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী আগামীর সময়কে বলছিলেন, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে। অথচ স্থলভাগে ছয় মাস থেকে দেড় বছরের মধ্যে গ্যাস আবিষ্কার করা সম্ভব। কিন্তু সেটি নিয়ে কোনো কথা নেই। স্থলভাগে অনুসন্ধানে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।






