সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের দেড় কোটি পাউন্ডের ফ্ল্যাট জব্দ লন্ডনে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
লন্ডনের রিজেন্টস পার্কের কাছে দেড় লাখ পাউন্ডের একটি ফ্ল্যাট বিক্রি ও হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট। বাংলাদেশের প্রভাবশালী চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের তদন্তের অংশ হিসেবেই এসেছে এই আদেশ। ফ্ল্যাটটির মালিক আনিসুজ্জামান রনি চৌধুরী বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের ভাই।
যুক্তরাজ্যের দুর্নীতিবিরোধী আইন অনুযায়ী, অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করতে না পারলে সুনির্দিষ্ট সম্পত্তি বেআইনি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেনা বলে ধরে নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টের কাছে ফ্ল্যাটটি জব্দের নির্দেশ চেয়েছিল ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)।
লন্ডনের প্রভাবশালী দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্ল্যাটটি অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের মতো সন্দেহভাজন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আনিসুজ্জামান রনি চৌধুরী তার একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন। তবে অর্থের উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
আদালতে দাখিল করা সাক্ষ্য বিবৃতিতে এনসিএর এক তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফ্ল্যাটটির মালিকানা কাঠামো ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ অস্পষ্ট। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র ১ পাউন্ডের বিনিময়ে ফ্ল্যাটের মালিক কোম্পানির শেয়ার অন্য একটি পক্ষের কাছে হস্তান্তর করে।
এনসিএর যুক্তি, শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে ফ্ল্যাটটির ওপর আনিসুজ্জামান রনি চৌধুরীর মালিকানা গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে কোম্পানিটির মালিকানা তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।
ফ্ল্যাটটি অপরাধলব্ধ অর্থে কেনা মনে করার কারণ যুক্তিসংগত বলে রায় দিয়েছেন বিচারপতি কারেন স্টেইন। এরপরই তিনি ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দেন। তবে দখল পুনরুদ্ধারের জন্য আনিসুজ্জামান রনি চৌধুরী যাতে আইনি কার্যক্রম চালাতে পারেন সে সুযোগও রেখেছেন বিচারপতি। আদালতে আনিসুজ্জামান রনি চৌধুরীর আইনজীবীরা নিষেধাজ্ঞার এই আদেশের বিরোধিতা করেননি।
আনিসুজ্জামান রনি চৌধুরীর ভাষ্য, তিনি কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। মালিকানা গোপন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
ভবিষ্যতে কোনো সম্পদ পুনরুদ্ধারের মামলা হলে এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হলে তিনি আইনি লড়াই অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছেন।
সাবেক মন্ত্রীর সম্পদ ঘিরে যুক্তরাজ্যে অনুসন্ধান
এই মামলাটি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদের বিষয়ে যুক্তরাজ্যে চলমান বৃহত্তর তদন্তের অংশ বলে জানতে পেরেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
গত বছরের জুন মাসে সাবেক এই মন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি জব্দ করে এনসিএ। একই সঙ্গে তিনি, তার স্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করার নির্দেশও আদায় করা হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্বজনরা ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৯ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সম্পত্তি গড়ে তুলেছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন। তার সরকার বিদেশে থাকা এসব সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে উদ্যোগ নিয়েছিল।
বাংলাদেশ সরকারের দাবি, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থ দিয়ে কেনা হয়েছিল এসব সম্পত্তি।
ভূমি নিবন্ধন দপ্তরের নথিতে দেখা গেছে, আনিসুজ্জামান রনি চৌধুরী ২০২৩ সালে ‘রনি ৪২ লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে ১ কোটি ২৪ লাখ পাউন্ডে ওই ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন। পরে কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করা হয়; রাখা হয় পিএনএন ইউকে প্রপার্টিজ।
এনসিএর আইনজীবীরা আদালতে বলেন, কোম্পানির শেয়ার মাত্র ১ পাউন্ডে হস্তান্তরের বিষয়টি ছিল সুবিধাজনক একটি ব্যবস্থা। ফ্ল্যাটটির বিপরীতে নেওয়া ঋণ পুনঃঅর্থায়নের চেষ্টা চলাকালে এ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঋণদাতা ছিল সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক। তবে উদ্যোগটি সফল হয়নি। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার পর ডিবিএস ব্যাংক সম্পত্তিটির দখল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।



