গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট
মানিয়ে নেওয়া ছাড়া গতি নেই আপাতত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আধুনিক জীবনের চাকা ঘুরতে অপরিহার্য বিদ্যুৎ আর জ্বালানি। এ দুটি ছাড়া বলতে গেলে সবকিছুই অচল। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জনজীবন অনেকটাই বিপর্যস্ত। শিল্পে উৎপাদন ব্যাহতের পাশাপাশি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। এ থেকে উত্তরণের উপায় কী? বিশেষজ্ঞ ও খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতি আর দীর্ঘদিন ধরে অল্প অল্প করে জমতে থাকা সংকট নিয়েছে প্রকট আকার। এখান থেকে দ্রুত মুক্তির কোনো অলৌকিক বা জাদুকরী পথ সরকারের হাতে নেই এই মুহূর্তে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘাটতি মেনে নিয়েই আপাতত চলতে হবে সবাইকে। তবে সরকার আন্তরিকভাবে কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারলে দেড়-দুই বছরের মধ্যে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলছিলেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে উৎপাদন না করলেও দিতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। এতে বাড়ছে আর্থিক চাপ। চাইলেই রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয় এই সংকটের।
তবে সরকার দেশের স্বার্থ রক্ষা করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে খুব অল্প সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যোগ করেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।
গত দেড় দশকে নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি আশানুরূপ হয়নি। উল্টো জ্বালানি খাতে বেড়েছে আমদানিনির্ভরতা। একই সময়ে শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান বড় হচ্ছে ক্রমেই। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এখন গড়ে চাহিদা ১৫-১৬ হাজার মেগাওয়াটের মতো। কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং ছাড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে প্রতি বছর গ্যাসের উৎপাদন কমছে গড়ে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট। এতে গ্যাসসংকট প্রকট আকার নিয়েছে। অবস্থা এখন এমন যে এক খাতে গ্যাস দিতে গেলে অন্য খাতে সংকট তৈরি হয়। রেশনিং করে কোনোমতে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানিসংকটের পাশাপাশি আরেকটি বড় সংকট হলো বিপুল পুরনো বকেয়া এবং অর্থের অভাব। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে মাত্রাতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে নিয়মিত। এই খাতে বকেয়া জমেছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা পাবে বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকরা। বকেয়া পরিশোধ না করলে জ্বালানি আমদানি করতে পারছে না— এমন দাবি করে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে কম। যদিও বিশেষ ক্ষমতা আইনে প্রতিযোগিতা ছাড়াই এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নানাভাবে সরকারের কাছ থেকে বিপুল অর্থ বাগিয়ে নিয়েছে এরই মধ্যে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, বর্তমান সরকার বিদ্যুতের দাম যে হারে বাড়িয়েছে তাতে নতুন করে আর বকেয়া পড়বে না। কিন্তু পুরনো বকেয়া পরিশোধ করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থেরও সংকট।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় তা এখন ১৬৫ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি থেকে কমবেশি ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। অথচ দৈনিক গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৩৮০-৪০০ কোটি ঘনফুট। সরকারের জ্বালানি বিভাগ বলছে, নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধান এবং সেখানে গ্যাস পাওয়া গেলে জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে সময় লাগবে দুই-তিন বছর। সেজন্যও অবশ্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। আবার এলএনজি আমদানি বাড়ানোরও নেই সুযোগ। সেজন্য আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও দরকার ন্যূনতম দেড়-দুই বছর।
সরকার এরই মধ্যে আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করেছে। গতকাল সেই দরপত্র জমার সময় শেষ হয়েছে। অন্যদিকে গ্যাসসংকটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কিছুটা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কয়লা আমদানিতেও অর্থের প্রয়োজন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছেও পিডিবির মোটা অঙ্কের বকেয়া জমেছে। এর মধ্যে শুধু পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রই পাবে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যয়বহুল হওয়ায় এখান থেকে বেশি উৎপাদন করলে সরকারের ভর্তুকি বেড়ে যাবে। তা ছাড়া এখানেও তেল আমদানিতে অর্থের প্রয়োজন। এই মুহূর্তে সরকারের হাতে বড় বিকল্প হলো সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়া।
তবে আশার কথা হলো, আগামী মাসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট এবং আগামী বছর দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা রয়েছে। কিন্তু নানান জটিলতায় দফায় দফায় উৎপাদনের সময় পেছাচ্ছে। নতুন কোনো জটিলতা না হলে এই কেন্দ্র থেকে পুরোপুরি বিদ্যুৎ মিলবে ২০২৭ সালের শেষ দিকে অথবা পরের বছরের প্রথমে। তাতে ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। কিন্তু ততদিনে বিদ্যুতের চাহিদাও যাবে বেড়ে। প্রতি বছর গড়ে ১ হাজার থেকে ১২০০ মেগাওয়াট চাহিদা বাড়ছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং স্থলভাগে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও রয়েছে সরকারের পরিকল্পনা।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ঘোষণা আর পরিকল্পনা করলেই চলবে না। দ্রুত এর সঠিক বাস্তবায়ন না হলে সংকট আরও বাড়বে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, দীর্ঘদিনের এই সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়; তবে সুযোগ আছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমান সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমেই এ খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমাতে হবে। অযোগ্য লোকদের সরিয়ে সঠিক স্থানে সঠিক লোক বসাতে হবে।
এই মুহূর্তে সংকট কাটাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি করা খুবই জরুরি। ব্যয়বহুল ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করলে ৪২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা দিয়ে বছরে ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করা যাবে। এতে তুলনামূলক কম দামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি, যোগ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে মুমূর্ষু রোগীর সঙ্গে তুলনা করে এই বিশেষজ্ঞ বললেন, ‘মন্ত্রণালয়ে এবং সরকারের আশপাশে যারা আছেন, তারা ভুল বোঝানোর কারণে সরকার অন্ধকারে রয়েছে। এটা সরকারকে বুঝতে হবে। না হলে সংকট আরও বাড়বে।’
সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলছিলেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। আমদানি করা এলএনজি দিয়ে সমাধান হবে না। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া খুবই জরুরি।




