বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগে উদ্বেগ

প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৭১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক, আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী, লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী।
ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি তদন্ত কমিটিগুলো বাতিলের দাবি জানান। পাশাপাশি এই তৎপরতা বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপও প্রত্যাশা করেন।
কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদ হাসানের মাধ্যমে আসা এই যৌথ বিবৃতিতে সই করেছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রফেসর এমিরেটাস ড. সুসান কলিন্সসহ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এম এম আকাশসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও রয়েছেন বিবৃতিদাতাদের মধ্যে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং টেলিগ্রাম গ্রুপে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা’র অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষককে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষক’ ব্যানারে একদল শিক্ষকের পক্ষ থেকে নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ জুলাই সিন্ডিকেট সভায় চার সদস্যের সত্যানুসন্ধান কমিটি গঠনের কথাও বলা হয় বিবৃতিতে।
ওই সভায় তিন শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের নিয়োগ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও আসে এ যৌথ বিবৃতিতে।
দুই বাক্যের একটি ফেসবুক পোস্টের কারণে একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের বিরুদ্ধে প্রক্টরিয়াল তদন্তের বিষয়টিও তুলে ধরেন বিবৃতিদাতারা।
তারা বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা ও রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের অধিকার আইনি কাঠামোয় স্বীকৃত। শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে তালিকাভুক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা মানবাধিকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধ বা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে মত দেন বিবৃতিদাতারা।
তাদের মতে, যারা শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করছেন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের অনেকেরও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ফলে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ঢালাও তদন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপেক্ষতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিবৃতিদাতারা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন শিক্ষক সমিতি এবং শিক্ষক-গবেষকদের রক্ষায় নিয়োজিত নেটওয়ার্ক ‘স্কলার্স অ্যাট রিস্ক’কে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক কমিউনিটিতে তাদের অবস্থান বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর নির্ভর করবে না; বরং তা নির্ভর করবে একাডেমিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর।’







