দেড় বছরে রাজনৈতিক খুনের অর্ধেকই বিএনপির
- দেড় বছরে নিহত ১৫৭ বিএনপিরই ৮৬ জন
- গত বছর ৪০১ সহিংসতা এবার পাঁচ মাসে ৩৪৭
- রাজনৈতিক বিরোধের চেয়ে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব বেশি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাড়ছে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা। গত দেড় বছর দেশ জুড়ে ঘটে যাওয়া ৭৪৮টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণ গেছে অন্তত ১৫৭ জনের, আহত হয়েছেন অন্তত ৭ হাজার ৩৮১ জন। অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, রাজনৈতিক বিরোধের চেয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, দরপত্র (টেন্ডার) নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলই এসব রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মূল কারণ। আর এই মোট নিহতের সিংহভাগই (৮৬ জন) ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী, যা দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের উদ্বেগজনক এক চিত্র সামনে এনেছে। তবে পুলিশের দাবি, এসব হত্যার বড় অংশই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক শত্রুতার জেরে ঘটলেও ভুক্তভোগীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তা রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর থেকে রাজনৈতিক সংঘাতের প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি বা দরপত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতাই সংঘাতের মূল কারণ। পাশাপাশি দলীয় নতুন ও পুরনো গ্রুপের দ্বন্দ্বও উসকে দিচ্ছে সহিংসতাকে। এসব রাজনৈতিক সহিংসতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে নতুন করে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট হতে পারে আরও গভীর।
গত মঙ্গলবার রাতে বাগেরহাটের ফকিরহাটে ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি ছিলেন সদর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি। একই ঘটনায় আহত হন একই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল্লাহ মোড়ল। এর আগের দিন সোমবার রাতে রাজধানী ঢাকার মৌচাকে ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ছুরির আঘাতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন। তাকে হত্যায় যাদের নাম আসছে, তারাও বিএনপির আরেক সহযোগী সংগঠন যুবদলের নেতাকর্মী।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত দেড় বছরে ৭৪৮টি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫৭, আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৮১ জন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বলি ৮৬ নেতাকর্মী।
জানা গেছে, গত বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১০২ জন। আহতের সংখ্যা ৪ হাজার ৭৪৪। নিহতদের মধ্যে ৭০ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। এর মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বের সহিংসতার ১৯২টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪০ নেতাকর্মী। আহত হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৩৮০ জন। যুবদলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১৬ সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হন ৮ জন। বিএনপি-যুবদলের সংঘর্ষে ৩, কৃষক দল-স্বেচ্ছাসেবক দলের সংঘর্ষে ২, স্বেচ্ছাসেবক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১, স্বেচ্ছাসেবক দল-যুবদলের সংঘর্ষে ৩, শ্রমিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১, বিএনপি-ছাত্রদলের সংঘর্ষে ৩, ছাত্রদল-ছাত্রদলের সংঘর্ষে ১, যুবদল-ছাত্রদলের সংঘর্ষে ৪, যুবদল-শ্রমিক দলের সংঘর্ষে ১ এবং স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৩ নেতাকর্মী।
এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৫ মাসে ৩৪৭টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৫ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৬৩৬ জন। নিহতদের মধ্যে ১৬ জন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। এই ৫ মাসে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ৭৯টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪ জন। আর আহত হয়েছেন ৭৪৫ জন। বিএনপি-যুবদলের সংঘর্ষে নিহত ১ এবং যুবদল ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণ গেছে একজনের। এ ছাড়া বিএনপি ও যুবদলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৬০ জন। স্বেচ্ছাসেবক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে ১৫ জন, বিএনপি ও ছাত্রদলের সংঘর্ষে ৬ জন, ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষে ১৩ জন এবং যুবদল-ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষে ১৩ জন আহত হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে পদ দখল এবং অর্থের সংস্থান যেখান থেকে হয়, সেই জায়গাগুলায় তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরের অপরাধগুলো দলীয় ব্যানারে ঘটিয়ে প্রতিশোধ নিতে চায়। সবমিলিয়ে আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে।
বিচারহীনতা অপরাধের প্রবণতাকে বাড়িয়ে দেয় উল্লেখ করে এই অপরাধ বিশ্লেষক বললেন, ‘যখন দেখা যায় অপরাধীকে বিচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না, তখন অপরাধপ্রবণতা জোরালোভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্যান্য সম্ভাব্য অপরাধীদের উৎসাহিত করে। সেই জায়গা থেকে দেশের স্বার্থে ও জনগণের স্বার্থে সরকারের এসব সহিংসতা কঠোর হাতে দমন করা উচিত।’
দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দলীয় পরিচয় না দেখে নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি বলে মত অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেনের। তিনি বললেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো— স্থিতিশীলতা যদি না থাকে, সেখানে লোকাল বা ফরেন ইনভেস্টমেন্ট (স্থানীয় বা বিদেশি বিনিয়োগ) আসবে না।’
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) গত মে মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই মাসে ঘটেছে ৩৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা। যার অধিকাংশই দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে। এর মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে ১৬টি। এসব ঘটনায় নিহত হন ৩ জন। যার একজন বিএনপি কর্মী, একজন জামায়াতে ইসলামীর ও একজন সাধারণ নারী।
সংস্থাটির বিভিন্ন সময়ের প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, এপ্রিলে সহিংসতার ৪৮টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে ২৮টি, মার্চে সহিংসতার ৫৬টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে ৩১টি, ফেব্রুয়ারিতে সহিংসতার ১৮টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দে ১০টি এবং জানুয়ারিতে সহিংসতার ২৪টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে হয়েছে ১৬টি সংঘর্ষ।
সহিংসতা দেশের সমাজব্যবস্থায় সহনশীলতার ঘাটতির প্রতিফলন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘ক্ষমতায় থেকে এক ধরনের রাজনৈতিক কোন্দল সৃষ্টি হয়, আর ক্ষমতায় না থেকে আরেক ধরনের কোন্দল সৃষ্টি হয়। পাওয়া-না পাওয়ার প্রসঙ্গে ঘটে খুন-খারাবি। এ ধরনের কোন্দল নতুন কোনো ঘটনা না। সহিংসতা আমাদের সমাজে সহনশীলতার ঘাটতিরই প্রতিফলন।’
সরকার ও রাজনৈতিক দলকে আলাদা করা এ ধরনের সহিংস পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ উল্লেখ করে তৌহিদুল হক বলছিলেন, ‘যে সরকারে থাকবে সে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকবে না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত মার্চ ও এপ্রিলে দেশে হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে মোট ৬০৫টি। এর মধ্যে ৩৩৬টি পূর্বশত্রুতা, ১৪৬টি পারিবারিক কলহ এবং ৬৯টি হয়েছে সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক বিরোধের জেরে। রাজনৈতিক কারণে হত্যা হয়েছে মাত্র তিনটি, যা মোট হত্যাকাণ্ডের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। পুলিশ বলছে, গত এক দশকে দেশে প্রতি বছর তিন হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার পর্যন্ত হত্যা মামলা হয়েছে। সেই হিসাবে দুই মাসের ৬০৫টি হত্যাকে বার্ষিক হারে রূপান্তর করলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৩০, যা আগের বছরগুলোর গড় প্রবণতার মধ্যেই রয়েছে। তাই এ সংখ্যাকে ‘অস্বাভাবিক বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনের দাবি, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই ব্যক্তিগত শত্রুতা, পারিবারিক কলহ কিংবা অর্থনৈতিক বিরোধজনিত। রাজনৈতিক কোন্দলের জেরে নয়। তিনি বলছিলেন, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রথম মনে হচ্ছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড; কিন্তু পরে তদন্তে দেখা গেছে, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ। যেহেতু ভুক্তভোগীর একটা রাজনৈতিক পরিচয় আছে, সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়টা মুখ্য হয়ে ওঠে। হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে কোনো ক্লাসিফিকেশন (শ্রেণিকরণ) আমাদের মাথায় থাকে না। আমাদের মাথায় থাকে তদন্ত করে ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও দোষীদের আইনের আওতায় আনা।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে আগাম তথ্য থাকে। সংঘর্ষ বা কোথাও যদি পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে মনে হয়, সেক্ষেত্রে পুলিশ আগাম ব্যবস্থা নেয়। পুলিশ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বিঘ্ন করতে যথেষ্ট সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’




