ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতায় উদ্বেগ সব ব্যাংকের
- রাজনৈতিক ইস্যুও দেখছেন গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে উদ্বেগের কথা জানান এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন। ছবি: সংগৃহীত
ইসলামী ব্যাংক ঘিরে চলমান অস্থিরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি)। তাদের মতে, এই পরিস্থিতি সব ব্যাংকের আমানতকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এ উদ্বেগের কথা তুলে ধরে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বললেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়, পুরো ব্যাংক খাতের সমস্যা। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকাররা উদ্বিগ্ন। নিয়মিত ব্যাংকার্স সভায় আলোচ্যসূচির বাইরে এ আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এই পরিস্থিতিকে শুধু ব্যাংক খাতের সমস্যা হিসেবে নয়, রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবেও দেখছেন গভর্নর।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) আওতায় সুদমুক্ত ক্ষুদ্র অর্থায়ন কর্মসূচির ব্যয় নিয়ে সংসদে বাগ্বিতণ্ডার পর হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে ব্যাংকটি। সেখানে দেখা গেছে, গত মে পর্যন্ত এই প্রকল্পের বিনিয়োগ স্থিতি দাঁড়ায় ৬ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায়। ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৫৯২ জন। ইসলামী ব্যাংক থেকে আরও জানা গেছে, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ঋণ স্থিতি কমেছে ১২৯ কোটি টাকা। আর ঋণগ্রহীতা কমেছে ১ হাজার ৬৩০ জন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুল আলমকে গতকাল ইসলামী ব্যাংকের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, ব্যাংকের ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার মাধ্যমে বৃহত্তর জনস্বার্থ নিশ্চিত করতেই এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দ্রুত সমাধানের দাবি এবিবির: ব্যাংকার্স সভা শেষে মাসরুর আরেফিন জানান, ইসলামী ব্যাংক ঘিরে চলমান পরিস্থিতিকে এখন শুধু ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। এটি রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে চেষ্টা চলছে সমাধানের।
‘ব্যাংকটি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক এবং বিষয়টির ক্রমবর্ধমান রাজনীতিকীকরণও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনা আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে’— বললেন মাসরুর আরেফিন।
সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকাররা উদ্বিগ্ন।
এবিবির চেয়ারম্যান বলেছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে গভর্নর কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) সঠিক তথ্য দেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন।
সভায় ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানান গভর্নর। পাশাপাশি ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)-তে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন তিনি।
বৈঠকে দেশের সব ব্যাংকের এমডিদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সব ডেপুটি গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আন্দোলন অব্যাহত: ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের পদত্যাগের দাবিতে অব্যাহত রয়েছে আন্দোলন। ছয় দফা দাবিতে অর্থমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন তারা। গতকাল দুপুর ১টার দিকে সচিবালয়ে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয় অর্থমন্ত্রীর কাছে। এরপর সংবাদ সম্মেলনে সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র অধ্যাপক নুর উন-নবী জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের দাবিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি জানান, খুরশীদ আলমের পদত্যাগসহ তাদের দাবিগুলো পূরণ না হলে বৃহস্পতিবার আরও বড় কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিন কোটি গ্রাহকের সবাইকে নিয়ে আরও বড় পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে চেয়ারম্যানের অপসারণ নিশ্চিত করা হবে।
আরডিএসে বিনিয়োগ ৬,৬৬০ কোটি: জাতীয় সংসদের অধিবেশনে গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংকের আরডিএসের মাধ্যমে ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এর মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকা নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পর আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে একটি রাজনৈতিক দলের তহবিলে।
বুধবার ইসলামী ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, প্রান্তিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাংকটির পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) আওতায় গত মে পর্যন্ত বিনিয়োগ স্থিতি ৬ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। গত নভেম্বরে বিতরণ হয় ৬৫৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া ডিসেম্বরে ৬৭০ কোটি, জানুয়ারিতে ৫৩০ কোটি ও ফেব্রুয়ারিতে বিতরণ হয়েছে ৫০৮ কোটি টাকা। চার মাসে মোট বিনিয়োগ ২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে নভেম্বরে ৬০৪ কোটি, ডিসেম্বরে ৫৬৮ কোটি, জানুয়ারিতে ৫৫৭ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ৪৮২ কোটি টাকাসহ মোট ২ হাজার ২১১ কোটি। সেই হিসাবে আদায়ের হার ৯৬ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে এই বিনিয়োগ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই ঋণস্থিতি ও গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে। তবে ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে জানুয়ারি মাস থেকে এ খাতের ঋণগ্রহীতা ও ঋণের অঙ্ক কমতে শুরু করে। নির্বাচনের পরও এ ধারা অব্যাহত থাকে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আরডিএস খাতে ব্যাংকটির বিনিয়োগ স্থিতি ছিল ৬ হাজার ৭৮৯ কোটি। তার আগের বছর ছিল ৬ হাজার ৭১৩ কোটি। ২০২৩ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা।




