নিভেছে অ্যাসিডের আগুন রয়ে গেছে ক্ষত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক ফোঁটা অ্যাসিড মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে একটি মানুষের পুরো জীবন। শুধু শরীর নয়, পুড়িয়ে দিতে পারে স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক, এমনকি বেঁচে থাকার ইচ্ছাটুকুও। দেশে একসময় মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া অ্যাসিড-সন্ত্রাস অনেকটাই কমে গেছে। কিন্তু তাতে কি যন্ত্রণা শেষ হয়েছে? পরিসংখ্যানের আড়ালে এখনো লুকিয়ে রয়েছে এমন অসংখ্য মানুষের গল্প, যাদের জীবন থমকে গেছে একটি নির্মম হামলার পর। নীলিমা, তাসলিমা কিংবা শামীমা— তাদের গল্পগুলো সে নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
সেদিন প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। তাই জানালা খোলা রেখেই বাবা-মেয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে হঠাৎ মনে হলো আগুনের মধ্যে পড়ে গেছেন নীলিমা খাতুন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারান। পরে হাসপাতালে চোখ খুলে জানতে পারেন, বাবাকে লক্ষ্য করে ছোড়া অ্যাসিডের পুরোটা এসে পড়েছে তার শরীরে।
যশোরের মনিরামপুরের নীলিমার বয়স তখন মাত্র আট বছর। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশীর প্রতিশোধপরায়ণতার শিকার হয়েছিলেন তিনি। সেই রাতের পর আর কোনো দিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।
অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের পুনর্বাসনকেন্দ্রে কথা হচ্ছিল নীলিমার সঙ্গে। বলছিলেন, ‘প্রথমে বুঝতেই পারিনি আমি কেমন হয়ে গেছি। পরে যখন মানুষজন দেখতে আসত, তাদের চোখের চাহনি দেখে বুঝতাম— আমি আর আগের মতো নেই। অনেকে আমাকে দেখে ভয় পেত, দৌড়ে পালিয়ে যেত।’
তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতেন বাবাকে দেখে। বললেন, “আব্বা খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। সবসময় মনে করতেন, তার জন্যই আমার এ অবস্থা। আমি তাকে বলতাম, ‘আব্বা, হয়তো এটাই আমার ভাগ্যে ছিল। আপনার দোষ কী’?”
গ্রামের মানুষের সহানুভূতির দৃষ্টিও তার ভালো লাগত না। করুণার চোখে বাঁচতে চাননি। তাই একসময় পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আশ্রয় নেন অ্যাসিডদগ্ধদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে। নীলিমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, হামলাকারীর শাস্তি হয়েছিল কি না। তিনি বলেছেন, ‘আসামিদের সাজা হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসেন তারা। তখন থেকেই আইনের প্রতি আমার আস্থা ভেঙে যায়।’
সেই ঘটনার প্রায় চার দশক পর, আজ ৪৬ বছর বয়সী নীলিমার জীবনে চাওয়া-পাওয়ার তালিকাও অনেক ছোট হয়ে এসেছে। ‘আমি বিয়ে করিনি। সাহস পাইনি। কাউকে বিশ্বাসও করতে পারিনি। আর কে-ই বা আমাকে বিয়ে করবে?’ কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে আসে নীলিমার। থেমে থেমে বলতে থাকেন, ‘আমার দুটি চোখই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটি চোখে অপারেশন হয়েছে, তবু সমস্যা। ডাক্তাররা বলেছেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হবে।’
ফুঁপিয়ে কেঁদে নীলিমা বললেন, ‘জীবনে আর কিছু পাওয়ার নেই। শুধু এ পৃথিবীর আলোটা দেখতে চাই। অন্ধ হয়ে যেতে চাই না। শেষ দিন পর্যন্ত অন্তত চোখে আলোটা রাখতে চাই।’
একই পুনর্বাসনকেন্দ্রে থাকা ময়মনসিংহের তাসলিমার গল্পও কম ভয়াবহ নয়। কলেজে যাওয়া-আসার পথে এক যুবক তাকে নিয়মিত উত্ত্যক্ত করত। কোনোভাবেই সাড়া না দেওয়ায় একদিন রাস্তা আটকে তার মুখে ছুড়ে মারে অ্যাসিড।
সেই মুহূর্তের কথা মনে করে তাসলিমা বলেছেন, ‘মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী আগুনে পুড়ছে। রাস্তায় গড়াগড়ি খেতে খেতে শুধু ভাবছিলাম, মৃত্যুর জন্য এত অপেক্ষা করতে হচ্ছে কেন? কেন দ্রুত সব শেষ হয়ে যাচ্ছে না?’ পরে হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে। শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা আর আজীবনের যন্ত্রণার পথচলা। পুনর্বাসনকেন্দ্রের আরেক বাসিন্দা শামীমা। তার বয়স এখন ৫০ বছর। ধীরে ধীরে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে তিনি বললেন, ‘আজ আপনি আমাকে দেখে মুখের আদলটা বুঝতে পারছেন। কিন্তু এটা ২৮টি অপারেশনের ফল। একটা সময় ছিল, মানুষ আমার দিকে তাকাতেই পারত না।’
একটু থেমে তিনি যোগ করেন, ‘অ্যাসিড শুধু শরীর পুড়িয়ে দেয় না, মানুষের ভেতরের মনটাকেও মেরে ফেলে। তারপর আর স্বপ্ন বলে কিছু থাকে না।’
নীলিমা, তাসলিমা কিংবা শামীমা একা নন। তাদের মতো হাজারো মানুষ অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন দেশে। অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে ৩ হাজার ৪৬৯টি অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৯১৫ জন।
২০০২ সালে সর্বোচ্চ ৪৯৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছিল। তবে সরকারি উদ্যোগ, কঠোর আইন এবং জনসচেতনতার ফলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ২০২২ সালে হামলার সংখ্যা নেমে আসে ১৮-তে। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১৩, ২০২৪ সালে ২০ এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২১ জুন পর্যন্ত অ্যাসিডসন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ১৯ জন।
অ্যাসিড হামলার হার কমলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে, এ নৃশংসতা এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। সর্বশেষ গত ৯ মে বরগুনার পাথরঘাটায় জমিসংক্রান্ত বিরোধে অ্যাসিড হামলার শিকার হন ফাতিমা জামাদ্দার অর্পা। শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায় তার। পরে থানায় গিয়ে আরও এক দফা মানসিক আঘাত পান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফাতিমার অভিযোগ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাকে উদ্দেশ্য করে কটূক্তি ও অশালীন মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সামিয়া আহমেদ জানিয়েছেন, দেশে প্রায় ৪৬ শতাংশ অ্যাসিড হামলার পেছনে রয়েছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হামলাকারী ভুক্তভোগীর পরিচিত ব্যক্তি। এ ছাড়া প্রতিশোধস্পৃহা, প্রেম ও বিয়েসংক্রান্ত বিরোধ, সামাজিক ও মানসিক সমস্যা এবং রাসায়নিক পদার্থের সহজলভ্যতাও অ্যাসিড-সন্ত্রাসের অন্যতম কারণ।
সামিয়া আহমেদ আরও বলেছেন, অ্যাসিড হামলার শিকার ব্যক্তিদের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সহায়তা, প্লাস্টিক সার্জারি এবং পুনর্বাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অপরাধ কমলেই সমস্যা শেষ নয় বলে মন্তব্য করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার ভাষায়, বাংলাদেশ অ্যাসিড-সন্ত্রাস কমাতে বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এখন এ হামলার ঘটনা প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু একেবারে শূন্যে নামানো সম্ভব হয়নি। এখনো এর শিকার হচ্ছেন অনেকে। এটিকে শূন্যের কোঠায় আনতে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি।
অ্যাসিডের আগুন অনেক আগেই নিভে গেছে। কিন্তু সেই আগুনের দগদগে ক্ষত এখনো বহন করে চলেছেন নীলিমাদের মতো অসংখ্য মানুষ। পরিসংখ্যান বলছে হামলা কমেছে; কিন্তু ভুক্তভোগীদের জীবনে সেই ক্ষত আজীবনের। তাই শুধু অপরাধ কমানো নয়, নিশ্চিত করতে হবে দ্রুত বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন। তবেই হয়তো একদিন সত্যিকার অর্থে অ্যাসিডমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হবে।




