মমতার পরাজয় কী বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশকে?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফল বলছে, বিজেপি জয় পেয়েছে ২০৮ আসনে। অন্যদিকে, তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৭৯টি আসন। এ ছাড়া সিপিএম ১, কংগ্রেস ২ ও অন্যরা জয় পেয়েছে ৩টি আসনে। এর আগে ২৯৩টি আসনে ২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ শেষে ৪ মে ফল ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়।
নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিজেপির ভোটের প্রচারণায় ছিল বাংলাদেশ ইস্যু, বিশেষ করে তারা উপজীব্য করেছে হিন্দু সম্প্রদায়কে। সেইসাথে মুসলিমদের টার্গেট করে তৈরি করেছে রাজনৈতিক বয়ান। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদেরকে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে বড় একটা অংশকে এই নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা ছাড়াও বিজেপি নেতারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও মুসলমানদের নিয়ে করেছে আপত্তিকর মন্তব্য।
বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তী কড়া ভাষায় অভিযোগ করেছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) পশ্চিমবঙ্গকে ‘পশ্চিম বাংলাদেশে’ পরিণত করার চেষ্টা করছে। তিনি হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই পরিস্থিতি প্রতিহতের ডাকও দিয়েছিলেন।
বিজেপি নেতারা অভিযোগ করে আসছেন, তৃণমূলের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যা রাজ্যের জনতাত্ত্বিক কাঠামো পরিবর্তন এবং তৈরি করছে নিরাপত্তা ঝুঁকি।
শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপি নেতাদের দাবি, এবারের নির্বাচনে হিন্দু ভোট একীভূত হয়েছে এবং তারা টিএমসির ‘তোষণনীতি’র বিরুদ্ধে বিজেপির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বিজেপি নেতাদের ভাষ্য, তারা ‘আসল বাঙালি’ সংস্কৃতি রক্ষা করতে চান, যা অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে।
বিজেপির নেতারা বাংলাদেশকে নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা মূলত অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ, রাজ্যের ‘সাংস্কৃতিক পরিচয়’ রক্ষা এবং হিন্দু ভোটারদের একজোট করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। নবান্ন দখল করার পর বিজেপি তাদের রাজনৈতিক বয়ানকে সরকার পরিচালনার অংশ বানিয়ে ফেলে কি না তা এখন দেখার অপেক্ষায়।
অন্যদিকে, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবসময় পশ্চিম বাংলার মুসলিম ভোটারদের সমর্থন পেয়ে আসছেন। বিশ্লেষকদের মতে, গত তিনবার পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম ভোটার প্রধান প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে।
মমতাও বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের ব্যাপারে তার সহানুভূতি প্রকাশে কোনো রাখঢাক করেননি। তিনি নিজে হিন্দু হয়েও মুসলমানদের ব্যাপারে দুর্বলতা প্রকাশকে বিজেপি সবসময় রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করে আসছে।
তা ছাড়া, বাংলা দখল করার জন্য কেন্দ্রে ক্ষমতাশীন বিজেপি হেন কোনো পদক্ষেপ নেই যা তারা নেয়নি। তারই একটি হলো— স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। এটি ভোটার তালিকার এক বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া। এসআইআরের মাধ্যমে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। অনুপস্থিত বা মৃত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে ৬০ লাখেরও বেশি ভোটারকে। আর ২৭ লাখের ভাগ্য ঝুলে আছে ট্রাইব্যুনালের বিচারের অপেক্ষায়।
বিচারাধীনদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ মুসলিম এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটার, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দলিত হিন্দুরাও। বেহানবক্স এবং সাবার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বাদ দেওয়া বা বিচারাধীন ভোটারদের ৬১.৮ শতাংশই নারী। দরিদ্র ও প্রান্তিক শ্রেণির নারীরা সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় আছেন।
অনেক বিশ্লেষকের মত, পশ্চিম বাংলার ভোটাররা বিজেপির মুসলিম ও বাংলাদেশ বিদ্বেষী প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে ভোট দিয়েছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর মুসলিম সেখানে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে তাদের রুটি-রুজিতে ভাগ বসাচ্ছেন, বিজেপির এই ন্যারেটিভে প্রভাবিত হয়েছেন তারা। সুতরাং, এ বিষয়ে দৃশ্যমান কিছু করার চাপ থাকবে বিজেপির ওপর। ফলে, মুসলিম ও বাংলাদেশ বিদ্বেষ নতুন মাত্রা পাবে পশ্চিম বাংলায়।
এমনকি পশ্চিম বাংলার মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে সীমান্তের এপারে ঠেলে পাঠানো উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে মনে করেন অনেক পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ। তা ছাড়া, সীমান্ত সংঘাত বেড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখছেন কেউ কেউ।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক থমাস কিট বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে সীমান্তের নিরাপত্তাকরণ আরও বাড়বে। নতুন চাপ তৈরি হতে পারে সাম্প্রদায়িক সম্পর্কে।
শুধু তাই নয়— মুসলিম সমাজের মধ্যে ভীতি রয়েছে যে পশ্চিম বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে কার্যকর করা হতে পারে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বা সিএএ। সিএএ কার্যকর করা হলে, যাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হবে তাদের বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে ঠেলে দেওয়া হতে পারে সীমান্তের এপারে।
এটা শুধু ধারণা নয়, বাস্তবেও তা এরই মধ্যে ঘটতে শুরু করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৪৭৯ জনকে জোর করে ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশে। পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির শক্তিশালীভাবে রাজনৈতিক উত্থান এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলবে বলে মনে করেন অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এম আশিক রহমান বলেছেন, রাজ্য সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কোনো পরিবর্তন হয় না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সরকারের সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে নয়।
তার মতে, নির্বাচনী প্রচারণার সময় রাজনৈতিক নেতারা অনেক কথা বলে যেমন আমরা দেখেছি আসামে বিজেপি প্রথমবার যখন সরকার গঠন করে, তার আগে নির্বাচনী প্রচারণায় অনেক কথা বলেছিল। কিন্তু সরকার গঠন করার পর এর তেমন কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
এই গবেষক মনে করেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে যেহেতু সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চাচ্ছে সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এমন কোনো আচরণ করবে না, যেটা এই উদ্যোগকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করবে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এ নির্বাচনকে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে মন্তব্য করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রথম কথা বিএনপির এখানে কোনো মনোভাব থাকার কথা না। এখানে ভারতের নির্বাচন হচ্ছে, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, ওদের গণতন্ত্রের ব্যাপার।’
‘আমরা সবসময় যে রকম বলে আসছি, আমাদের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক, সে রকমই আমরা চাইবে, আমাদের আশপাশের দেশগুলো ভারতসহ সব দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক ও গণতন্ত্রের বিজয় হোক’, যোগ করেন তিনি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেছেন, ‘একটি দেশের ফরেন পলিসি একটি দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হয়। আমাদের দেশের ফরেন পলিসি আমরা আগেই বহুবার বলেছি, আজকেও বলছি, প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ফরেন পলিসিতে চলব আমরা। সেটা অন্যান্য দেশে যে সরকারই আসুক না কেন, আমাদের ফরেন পলিসি একই থাকবে।’



