জুলাই আন্দোলন রাষ্ট্রচিন্তাকে নতুন পথে নিয়ে গেছে

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
আমার কাছে জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যদি বাংলাদেশের ইতিহাসের বড় মাইলফলকগুলো দেখি, তাহলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন— এই চারটি ঘটনাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।
রাষ্ট্র শুধু একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়; রাষ্ট্রের একটি দর্শন, মূল্যবোধ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা থাকে। আমার বিশ্বাস, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষাই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। বাকস্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা এই আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল। তবে এই আন্দোলন হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ কাজ করেছে। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ছাত্রসমাজের ক্ষোভ প্রকাশ পেতে শুরু করে। তখন নানা কারণে সেই আন্দোলন সফল হয়নি এবং তা দমন করা হয়েছিল। এরপর মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নাগরিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার কারণে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়তে থাকে।
১ জুলাই থেকে নতুন করে কোটা আন্দোলন শুরু হয়। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলে তা ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে এটি ছিল চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। দমনপীড়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ এবং সমাধানের উদ্যোগের অভাবে এটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। তখন সাধারণ মানুষও এতে যুক্ত হন। ফলে এটি শুধু কোটা সংস্কারের আন্দোলন না থেকে রাষ্ট্রীয় অধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার আন্দোলনে পরিণত হয়।
আমি নিজে সরাসরি মাঠে নামিনি, কারণ আমার কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। আমার পরিবারের সদস্যরাও আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
আগস্টের শুরুতে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১ ও ২ আগস্ট ছাত্রনেতারা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরপর প্রায় সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আন্দোলনের পক্ষে যেতে থাকে। শুধু তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো এর বাইরে ছিল।
২২ জুলাই আমি একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম, যা প্রকাশ করা নিয়েও অনেকের দ্বিধা ছিল। নিবন্ধটির মূল বক্তব্য ছিল— ‘শুধু কোটা সংস্কার নয়, বহুলোকের প্রাণ গেল, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ।’ সেখানে আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, সংকটের সমাধান শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন।
এদিকে ৪ আগস্ট একটি অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা সামনে আসে। পরে বঙ্গভবনে বিভিন্ন পক্ষের বৈঠক হয়। সেখানে ছাত্র প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রপতি এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
আমি সেই সরকারের একজন সদস্য হিসেবে অর্থ, পরিকল্পনা, বাণিজ্যসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করি। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করা।
আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা পেয়েছি, তা ছিল অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। ব্যাংক খাতে বড় ধরনের দুর্বলতা, আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার— সব মিলিয়ে অর্থনীতি প্রায় আইসিইউতে ছিল।
আমাদের লক্ষ্য ছিল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল, রাজনৈতিক সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করা এবং প্রশাসন ও সামাজিক খাতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করা। আট মাসে সব সংস্কার সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, তবে আমরা একটি ইতিবাচক সূচনা করতে পেরেছিলাম।
আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের অভাব। রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
তারপরও আমরা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক লেনদেন এবং সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও আগের তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে। একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে প্রথম প্রয়োজন স্থিতিশীলতা। আমরা অন্তত সেই ভিত্তিটি তৈরি করতে পেরেছিলাম।
আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হলো, এত বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জন্য আট মাস যথেষ্ট সময় নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বা পরিবর্তনকালীন প্রশাসন কয়েক বছর সময় নিয়ে সংস্কার সম্পন্ন করেছে।
সিরিয়ার উদাহরণ নিন। সেখানে নতুন প্রশাসন শুরুতেই বলেছে, সংস্কারে পাঁচ বছর সময় লাগবে। ইরাকেও দীর্ঘ সময় লেগেছে। আমাদের ক্ষেত্রে আমরা শুরু থেকেই দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নীতি অনুসরণ করেছি। আমাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো রাজনৈতিক আগ্রহ ছিল না। তবে একটি সুস্পষ্ট সংস্কার রোডম্যাপ ও সময়সূচি থাকলে অনেক কাজ আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়, কিন্তু অর্থনৈতিক সংস্কারের অনেক কাজ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিও অত্যন্ত জটিল। জ্বালানিসংকট, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার চাপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়।
আমি মনে করি, জুলাই শুধু একটি আন্দোলন নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
রাষ্ট্র শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি জনগণের সঙ্গে একটি সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সরকার জনগণের নিরাপত্তা, অধিকার ও সেবা নিশ্চিত করবে, আর নাগরিকরা আইন মেনে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবে। এই পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ধারণাটিই সামাজিক চুক্তির মূল ভিত্তি।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়েছিল। সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহির পরিবর্তে ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল। জুলাই আন্দোলন সেই প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে— রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব কী, সরকার কাদের জন্য এবং কীভাবে পরিচালিত হবে। আমার মতে, জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অবদান এখানেই। এটি রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন একটি জায়গায় নিয়ে এসেছে। এখন অধিকাংশ রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে— রাষ্ট্রের চরিত্র কী হবে, সরকারের ভূমিকা কী হবে এবং জনগণের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
এ কারণেই আমি মনে করি, জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তা, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার নতুন ভিত্তি নির্মাণের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।




