৫০ কারারক্ষীকে তলব করে সতর্ক
লাইক-কমেন্টের মোহ, বিধিমালা ভুলছেন সরকারি কর্মচারীরা
- আইন আছে পরিপত্রও জারি হয়েছে বহুবার। তবুও নেই তোয়াক্কা
- আইনি নোটিস ও কারণ দর্শানোর সম্মুখীন বিচারক থেকে শুরু করে প্রশাসনের কর্তারাও

সংগৃহীত ছবি
আইন আছে, পরিপত্রও জারি হয়েছে বহুবার। তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালে তার তোয়াক্কা নেই বললেই চলে। একের পর এক বিতর্কিত পোস্ট, সরকারি নথির অননুমোদিত প্রকাশ আর পোশাক পরিহিত ছবি ও ভিডিও বানিয়ে ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রতিযোগিতা— সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নীতিমালার ধার ধারছেন না সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ। বারবার কড়া বার্তা দিলেও বদলাচ্ছে না চিত্রপট। ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই খামখেয়ালিপনায় ক্ষুণ্ন হচ্ছে প্রশাসনের শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তিকে হেয় করে পোস্ট কিংবা প্রতিক্রিয়া দিতে পারেন না। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শুধু সাধারণ প্রশাসনিক কর্মকর্তা-
কর্মচারীই নন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক এবং অস্ত্রসহ ছবি ও ভিডিও পোস্ট করার প্রবণতাও বেড়েছে। সম্প্রতি এমনই এক কাণ্ড ঘটিয়ে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন কারাগারের অন্তত ৫০ জন কারারক্ষী। একই ধরনের অভিযোগে আইনি নোটিস ও কারণ দর্শানোর সম্মুখীন হয়েছেন অধস্তন আদালতের বিচারক থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসনের পদস্থ কর্তারাও।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দাপ্তরিক পোশাকে অস্ত্রসহ ছবি ফেসবুকে আপলোডসহ অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তথ্য প্রচারের অভিযোগে গতকাল রবিবার দেশের বিভিন্ন কারাগারে কর্মরত ৫০ কারারক্ষীকে তলব করে কারা অধিদপ্তর। শুনানি শেষে তাদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে— ভবিষ্যতে অস্ত্রসহ অফিসিয়াল পোশাকে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি আপলোড করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) আবুল বাসার। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘সারা দেশের অন্তত ৫০ জন কারারক্ষীকে কারা অধিদপ্তরে ডাকা হয়েছিল। তাদের ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯’ এবং এ-সংক্রান্ত পরিপত্র স্মরণ করিয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, ওই কারারক্ষীরা সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে নিজ নিজ আইডি থেকে অফিসিয়াল পোশাকে একাধিক ছবি আপলোড করেছেন। কোনো কোনো সদস্য নিজেদের অ্যাকাডেমিক, আঞ্চলিক, ব্যাচভিত্তিক ও ইয়ারভিত্তিক গ্রুপগুলোতে আবার কেউ কেউ অস্ত্রসহ কারারক্ষীর পোশাকেও ছবি পোস্ট করেন। ফেসবুকে অস্ত্রসহ ছবি পোস্ট করায় গত ৩০ জুলাই অন্তত ৫০ কারারক্ষীকে ২ আগস্ট প্রধান কার্যালয়ে হাজির থাকতে নির্দেশ দিয়ে অফিস আদেশ জারি করে কারা অধিদপ্তর।
ওই আদেশে বলা হয়, ‘এর আগেও ঢাকা থেকে একাধিক পত্রের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম/সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারসংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়ে। তারপরও ওই নির্দেশনা অমান্য করে ৫০ জন কারারক্ষী (নাম, কর্মস্থল ও কারারক্ষী নম্বর উল্লেখ করে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম/সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে অস্ত্রসহ ছবি আপলোড করেন। তাদের আগামী ২ আগস্ট সকাল ৯টায় ঢাকার কারা অধিদপ্তরে উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।’
যাদের তলব করা হয়েছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন— লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের কারারক্ষী মোছা. মীম, কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের শিপ্রা বিশ্বাস, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের আসাদুজ্জামান, পঞ্চগড় জেলা কারাগারের মোহাম্মদ সাকিব, কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১-এর রাসেল আহমেদ, সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের ওয়াজকুরুনী, নীলফামারী জেলা কারাগারের খুশি খাতুন ও হাবিবুর রহমান, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাতিমা বেগম ও তানজিল হোসেন, ফেনী জেলা কারাগার-১-এর সাইদুর রহমান ও ফাতেমা আক্তার, ফেনী জেলা কারাগার-২-এর সাখাওয়াত হোসেন ও সাইফুল ইসলাম সানি, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের খায়রুল ইসলাম, রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামিউল ইসলাম, ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের সিহাব সিদ্দিকী, লালমনিরহাট জেলা কারাগারের রাফিল উদ্দিন, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের মো. লিটন ও সাইদার হোসেন, বগুড়া জেলা কারাগারের জাকিরুল ইসলাম, নেত্রকোনা জেলা কারাগারের সাগর মিয়া, মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারের নুর এ আলম নাঈম, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের নিশিকান্ত দেবনাথ, নাহিদ হাসান প্রমুখ।
এর আগে গত ৭ এপ্রিল বিচার বিভাগ নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় অধস্তন আদালতের ২৮ বিচারককে কারণ দর্শানোর নোটিস (শোকজ) দিয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। শোকজের চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আপনার নিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে নানাবিধ বিরূপ মন্তব্য উসকানি প্রদানের মাধ্যমে ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগের জারি করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারসংক্রান্ত নির্দেশনা অমান্য করেছেন, যা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য। এ ছাড়া আপনি এমন কার্যকলাপের দ্বারা ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা, ২০১৭’-এর বিধি ২ (চ) (২)-এ উল্লিখিত চাকরির শৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর কার্যে লিপ্ত হয়েছেন, যা অসদাচরণের শামিল।’ এ অবস্থায় ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা, ২০১৭’ অনুযায়ী বর্ণিত অভিযোগের বিষয়ে চিঠি পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকদের লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করার অনুরোধ জানায় আইন ও বিচার বিভাগ।
তারও আগে গত বছরের ১৫ জানুয়ারি নির্দেশনা ও বিধিমালা না মেনে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ নির্দেশনা দিয়ে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯’ অনুযায়ী পরিহারযোগ্য বিভিন্ন বিষয়ে পোস্ট দিচ্ছেন। তারা বিভিন্ন ডকুমেন্টস শেয়ার করছেন এবং ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারকে বিব্রত করে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, যা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সার্ভিস রুলস পরিপন্থী ও অগ্রহণযোগ্য আচরণ। দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল। অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হানিকর এবং সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণের পর্যায়ভুক্ত অপরাধ।’ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ ধরনের বিভিন্ন ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হওয়ায় রেগুলেটরি মন্ত্রণালয় হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তার আগে গত বছরের ৩ জুলাই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সাবেক সহকারী কমিশনার তাপসী তাবাসসুম ঊর্মিকে চাকরিচ্যুত করেছিল সরকার। রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত আবু সাঈদকে নিয়েও স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ঊর্মি। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর তাকে ওএসডি করা হয়।






