৮৫ শতাংশ পথশিশু মাদকাসক্ত

ছোট পলিথিন ব্যাগ। তার ভেতরে হলদেটে তরল আঠা। ব্যাগের মুখে নাক-মুখ চেপে জোরে জোরে শ্বাস টানছে ১০ বছরের শিশু রাহাত। চোখের মণি দুটো উল্টে যাচ্ছে, মুখমণ্ডলে এক অদ্ভুত অসাড়তা। ঢাকার কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশে বসে এভাবেই বুঁদ হয়েছিল সে। এটা হয়তো একধরনের নেশা, তবে পথশিশুদের কারও কারও কথায়— ‘এই আঠার বাতাস নিলে আর ক্ষুধার কষ্ট থাকে না। ঘুম চলে আসে।’
রাহাতের মতো হাজারো শিশু রাজধানীর বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, পার্ক আর ফুটপাতে প্রতিদিন এভাবে নেশা করে ধাবিত হচ্ছে মৃত্যুর দিকে। স্থানীয়ভাবে এটি ‘ড্যান্ডি’ বা ‘গাম’ সেবন নামে পরিচিত। জুতা তৈরিতে ব্যবহৃত এই উদ্বায়ী তরল আঠা এখন পরিণত হয়েছে পথশিশুদের সস্তা এবং সহজলভ্য মরণনেশায়।
রামপুরা ফুটওভারব্রিজের ওপরে দেখা হয় ৯ বছরের ইমনের সঙ্গে। মা-বাবার খোঁজ নেই, সারা দিন কাগজ কুড়িয়ে যা পায় তা দিয়ে কোনোদিন খাওয়া জোটে, কোনোদিন জোটে না। ইমন বলে, টাকা না থাকলে পেটে যখন খুব ক্ষুধা লাগে, তখন এই আঠার বাতাস নিলে আর ক্ষুধার কষ্ট থাকে না। ঘুম চলে আসে।
মাত্র ২০-৩০ টাকায় এক কৌটা ড্যান্ডি আঠা কিনে চার-পাঁচজন বন্ধু মিলে পলিথিনে ভরে সারা দিন চলে এ নেশা। ক্ষুধার তীব্রতা ও নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা আড়াল করতেই ইমনদের মতো শিশুরা পা দিয়েছে এই মরণফাঁদে।
ইউনিসেফ ও সরকারের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে পথশিশু রয়েছে ৩৪ লাখের বেশি। এর বিশাল অংশই বাস করে রাজধানীতে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) ও বিভিন্ন মাদকবিরোধী সংস্থার মতে, ঢাকা শহরে রয়েছে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ পথশিশু। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই পথশিশুদের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশই কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত, যার মধ্যে প্রায় ৫০ ভাগেরই প্রধান নেশা ড্যান্ডি বা আঠা সেবন। এটি সস্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়া সহজ এবং যেকোনো হার্ডওয়্যারের দোকানে এবং মুচির কাছে সহজেই পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ধূমপানে আসক্ত ৪৪ শতাংশ পথশিশু। ২৮ শতাংশ পথশিশু বিভিন্ন ট্যাবলেট সেবন করে এবং হেরোইন সেবন করে ১৯ শতাংশ। আর ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে।
সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরে স্পট রয়েছে কমপক্ষে ২২৯টি। এসব জায়গায় ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে।
আইসিডিডিআরবি এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের গবেষণা বলছে, ইনহেলার জাতীয় এই মাদকের কারণে পথশিশুরা সম্মুখীন হচ্ছে মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির। সারা দিন কাগজ কুড়িয়ে বা ছোটখাটো কাজ করে যে সামান্য অর্থ তারা পায়, তার একটি বড় অংশ খাবারের পেছনে নয়; বরং ব্যয় করে ড্যান্ডি কেনার পেছনেই। ফলে তারা ধীরে ধীরে পরিবার, শিক্ষা ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
১৪ বছরের সজীব। গুলিস্তান এলাকায় ড্যান্ডি সেবন করতে করতে এখন সে জড়িয়ে পড়েছে নানা অপরাধে। আগামীর সময় প্রতিবেদককে সজীব জানায়, নেশার টাকা জোগাড় করতে প্রথমে সে সাধারণ চুরি ও পকেটমারি শুরু করে। এখন ড্যান্ডি খাওয়ার পর তার নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। স্থানীয় কিছু মাদক কারবারি ও অপরাধী চক্র অল্প কিছু টাকায় বা ড্যান্ডির বিনিময়ে তাদের ছিনতাই ও মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করছে।
ড্যান্ডি আসক্তি কীভাবে একটি শিশুকে স্থায়ী অপরাধী বানিয়ে তুলছে? সজীবরাই তার জলজ্যান্ত উদাহরণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সমাজ-অপরাধবিষয়ক গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলছিলেন, ‘যে শিশু শৈশব থেকেই দারিদ্র্য, অবহেলা ও বঞ্চনার মধ্যে বেড়ে ওঠে মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে, তার পক্ষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন। এমন শিশুরা পরে বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। তাই শুধু আইন প্রয়োগ নয়; বরং পুনর্বাসন, শিক্ষা, মানসিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলেই তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘অল্পবয়সী শিশুদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি সীমাবদ্ধতা থাকায় তাদের পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি এনজিও ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’
ড্যান্ডির ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, ‘ড্যান্ডিতে থাকা টলুইন ও অন্যান্য উদ্বায়ী রাসায়নিক উপাদান শিশুদের মস্তিষ্কের কোষের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। ফলে শিশুদের স্মৃতিশক্তি কমে যায়, আচরণ খিটখিটে ও আগ্রাসী হয় এবং বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশন দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এ নেশা চললে স্নায়ুতন্ত্র, হৃদযন্ত্র, লিভার ও কিডনির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে; এমনকি আকস্মিক মৃত্যুও অস্বাভাবিক নয়। এই শিশুদের অপরাধী হিসেবে না দেখে, তাদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’





