জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে ২ কোটি ২০ লাখ শিশু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে এরই মধ্যে লাখ লাখ শিশু অতিরিক্ত বিপজ্জনক তাপজনিত চাপের মুখে পড়ছে। নতুন এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ০-৯ বছর বয়সী ২ কোটি ২০ লাখ শিশু (মোট শিশুর প্রায় ৭৯ শতাংশ) মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর অন্তত এক মাস অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের সম্মুখীন হচ্ছে।
ভ্রিজে ইউনিভার্সিটেট ব্রাসেলের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং সায়েন্স অ্যাডভান্সে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য।
বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ০-৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতি বছর অন্তত পাঁচ মাস (১৫০ দিন) মোট বিপজ্জনক তাপজনিত চাপের মুখোমুখি হওয়া শিশুর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন না থাকলে এই সংখ্যা যেখানে ৯০ লাখ হওয়ার কথা। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখ। যা এই বয়সী মোট শিশুর ৯১ শতাংশ।
বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত একটি বড় সংকটের অংশ। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় ০-৯ বছর বয়সী ১৬ কোটি ৭৪ লাখ শিশু। অর্থাৎ এই বয়সী মোট শিশুর প্রায় ৬২ শতাংশ। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরে অন্তত এক মাস অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের মুখে রয়েছে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে প্রতি বছর অন্তত পাঁচ মাস বিপজ্জনক তাপজনিত চাপের মুখে থাকা শিশুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৮ কোটি থেকে বেড়ে ১৫ কোটি ৬৬ লাখে।
বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, ০-৯ বছর বয়সী সর্বোচ্চ ৫৬ কোটি শিশু। অর্থাৎ এই বয়সী মোট শিশুর ৪৩ শতাংশ। বর্তমানে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর অন্তত এক মাস অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের মুখে পড়ছে। অন্যান্য বয়সী জনগোষ্ঠীর তুলনায় শিশুদের এই ঝুঁকি বেশি।
অতিরিক্ত গরমে শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় তাদের শরীর দ্রুত উত্তপ্ত হয়। ঘামের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কম এবং সুরক্ষার জন্য তারা প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অতিরিক্ত গরমের কারণে পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোক হতে পারে, বিদ্যমান স্বাস্থ্য সমস্যা আরও গুরুতর হতে পারে এবং শিশুদের শেখার ও মানসিক বিকাশেও প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণায় আর্দ্রতাজনিত তাপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যা ছায়ায় ২৮°C-এর বেশি ওয়েট-বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার দিয়ে পরিমাপ করা হয়েছে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘামের মাধ্যমে শরীর কার্যকরভাবে তাপ ছেড়ে দিতে পারে না। ফলে এ ধরনের তাপ শরীরের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়লে বাংলাদেশে শিশুদের তাপজনিত চাপের ঝুঁকি আরও ব্যাপক হতে পারে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫°C-এর মধ্যে সীমিত রাখা গেলেও বাংলাদেশে ০-৯ বছর বয়সী ২ কোটি ৩০ লাখ শিশু (৮৭ শতাংশ) প্রতি বছর অন্তত এক মাস অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের মুখে পড়তে পারে। একই সময়ে ২ কোটি ৫০ লাখ শিশু (৯৩ শতাংশ) বছরে অন্তত পাঁচ মাস মোট তাপজনিত চাপের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ২°C-এ পৌঁছালে বাংলাদেশে এই বয়সী ১ কোটি ৯০ লাখ শিশু (৯৮ শতাংশ) প্রতি বছর অন্তত এক মাস অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের মুখে পড়বে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১ কোটি ৯০ লাখ শিশু (৯৭ শতাংশ) বছরে অন্তত পাঁচ মাস তাপজনিত চাপের মুখে পড়তে পারে।
এই প্রক্ষেপণগুলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র গরম মোকাবিলায় আরও প্রস্তুত করার গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তাপঝুঁকি আরও বাড়তে না দেওয়ার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট নিঃসরণ দ্রুত কমানোও জরুরি।
গবেষকরা সতর্ক করেছেন, উন্নয়নশীল দেশের শিশুরা জলবায়ুজনিত চরম পরিস্থিতির তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দারিদ্র্য, অপর্যাপ্ত আবাসন, শীতল পরিবেশে থাকার সীমিত সুযোগ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ শিশুদের চরম গরমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা আরও কমিয়ে দিতে পারে।
‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব জুড়ে এরই মধ্যে কোটি কোটি শিশু বিপজ্জনক তাপের শিকার হচ্ছে, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। উন্নয়নশীল দেশের শিশুরা এখন এবং ভবিষ্যতে জলবায়ুজনিত চরম পরিস্থিতির তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে’, বলেছেন গবেষণার প্রধান লেখক এবং ভ্রিজে ইউনিভার্সিটেট ব্রাসেলের পিএইচডি গবেষক রোসা পিয়েত্রোইউস্তি।
কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) ডা. শিমুল মাজুমদার বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র গরমের প্রভাব শিশুদের মধ্যেও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রোদে খেলাধুলার পর হঠাৎ বমি, অতিরিক্ত ক্লান্তি, অস্থিরতা ও ক্ষুধামন্দার মতো সমস্যা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।






