৬৭ চ্যালেঞ্জ, ১৭ লক্ষ্যের ১৩টিতেই ব্যর্থতা
- বাংলাদেশে এসডিজি বাস্তবায়ন অগ্রগতি
- দুর্নীতি কমানো না গেলে কোনো কিছুই অর্জন হবে না -আমির খসরু, মাহমুদ চৌধুরী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘুষ, দুর্নীতিসহ ৬৭ চ্যালেঞ্জে ঘুরপাক খাচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। ১৭ লক্ষ্যমাত্রার ১৩টির অবস্থাই বেহাল। সামান্য অগ্রগতি আছে চারটিতে। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত এই মাইলফলক বাস্তবায়নে বেঁধে দেওয়া রয়েছে সময়সীমা। দেশে এসডিজি বাস্তবায়নের পথে অন্যতম কয়েকটি অন্তরায় হলো— মামলাজট, ন্যায়বিচার না পাওয়া, রাজস্ব আদায় কম, ব্যক্তির পকেট থেকে যাওয়া অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়, জাতীয় আয়ের ৪১ দশমিক ১০ শতাংশ ধনাঢ্য পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা, কর্মসংস্থান না হওয়া, বায়ুদূষণ, জলবায়ু অর্থায়নে ঘাটতি এবং অসংক্রামক ব্যাধি। আরও আছে আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং খেলাপি ঋণের উচ্চ হার। খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তৈরি করা মূল্যায়নে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসডিজি বাস্তবায়নে কিছুটা এগিয়ে থাকা চারটি লক্ষ্যমাত্রা হলো— দারিদ্র্য বিলোপ, গুণগত শিক্ষা, জেন্ডার সমতা এবং সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানি। এ ছাড়া দুরবস্থায় থাকায় লক্ষ্যমাত্রাগুলো হচ্ছে— ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক মুক্তি এবং শিল্প উদ্ভাবন ও অবকাঠামো। আরও আছে অসমতা হ্রাস, টেকসই নগর ও জনপদ, পরিমিত ভোগ ও টেকসই উৎপাদন, জলবায়ু কার্যক্রম, জলজজীবন, স্থলজজীবন, শান্তি-ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অংশীদারত্ব।
‘এসডিজির ১৬ নম্বর লক্ষ্যমাত্রা (শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান) বাস্তবায়নে অন্যতম চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি। ঘুষ ও দুর্নীতির প্রাদুর্ভাব (২৫ শতাংশ ব্যবসায়িক লেনদেনে ঘুষের অভিযোগ) প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার পথে বড় অন্তরায়। এ ছাড়া বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন এবং তথ্য কমিশনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও এর বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে চ্যালেঞ্জ। মানব পাচারের হার প্রতি লাখে ১ দশমিক ৭৮ থেকে কিছুটা কমে শূন্য দশমিক ৭২-এ নেমে এলেও নারী পাচারের চিত্র একই আছে। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থায় মামলাজট ও কারাভোগকারী আসামিদের মধ্যে বিচারাধীন বন্দির উচ্চ হার (৭৭ শতাংশ) বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। একই সঙ্গে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থার অভাব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তৈরি করছে গুরুতর চ্যালেঞ্জ’— উল্লেখ করা হয় জিইডির প্রতিবেদনে।
এসডিজি ৩ (সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ) সম্পর্কে বলা হয়েছে, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়ন হলেও যক্ষ্মা রোগের হার অপরিবর্তিত থাকা এবং মোট মৃত্যুর ২৪ শতাংশ অসংক্রামক ব্যাধির (হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ) কারণে হওয়ার বিষয়টি নতুন চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ। একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতাও প্রকট।
এসডিজি ১০ (অসমতা হ্রাস) বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আয়বৈষম্য নিরসনে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ২০১৬ সালের গিনি সূচকের মান শূন্য দশমিক ৪৮ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে প্রায় শূন্য দশমিক ৫০-এ দাঁড়িয়েছে। জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশ রয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ ধনাঢ্য পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। যেখানে দরিদ্রতম ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে মাত্র ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ছাড়া কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় আঞ্চলিক এবং জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য এবং ২০২৫ সালে ১৯ দশমিক ৩১ শতাংশ জনগোষ্ঠীর নানাবিধ হেনস্তা ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার তথ্য উদ্বেগজনক। আর্থিক খাতের অস্থিতিশীলতা, বিশেষত খেলাপি ঋণের উচ্চ হার (১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ) এবং পরোক্ষ করের ওপর অধিক নির্ভরশীলতা সীমিত করছে পুনর্বণ্টনমূলক রাজস্ব নীতির কার্যকারিতাকে।
প্রতিবেদনটি তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ঘুষ-দুর্নীতি তো আছেই। এর সঙ্গে এসডিজি ১৩ (জলবায়ু কার্যক্রম)-এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে আক্রান্তের হার কমলেও এখনো চরম আবহাওয়াজনিত ঝুঁকির মুখে রয়েছে দেশ। ২০২১ সালে দুর্যোগজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু অর্থায়নের বিপুল ঘাটতিও বড় চ্যালেঞ্জ। যেখানে ২০২৫ সালের প্রয়োজনীয় ১২ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে পাওয়া গেছে ১১৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার।
প্রতিবেদনে এসডিজি ২ (ক্ষুধামুক্তি)-এর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অপুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হারে অগ্রগতি হলেও, খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জলবায়ুু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ (বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়) এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি খাদ্য উৎপাদন ও প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। এ ছাড়া চরম আবহাওয়া ও সম্পদ কমায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত।
এসডিজি ৯ (শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো)-এর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শিল্পায়ন, উদ্ভাবন এবং টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত। তবে মোট কর্মসংস্থানে শিল্প খাতের অবদান মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ধীরগতি পরিলক্ষিত। এ ছাড়া জিডিপির তুলনায় গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ, অত্যন্ত নগণ্য।
এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের অন্তরায় জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, দুর্নীতি বাংলাদেশের একটি অন্যতম সমস্যা। যদি এটি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে কোনো িকছুই হবে না। এজন্য দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যা কিছু আছে, এসডিজিতেও তা নেই। তাই নির্বাচনী ইশতেহার যত বেশি বাস্তবায়ন হবে, এসডিজিও তত বেশি বাস্তবায়ন হবে। আমরা এভাবেই এগোচ্ছি।




