পরিবেশ সাংবাদিকতার বদলে যাওয়া ভাষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় পরিবেশ সাংবাদিকতা মানে ছিল নদীদূষণ, বন উজাড়, শিল্পকারখানার কালো ধোঁয়া কিংবা “সাপ উদ্ধার”, “বাঘের আতঙ্ক”, “হাতির হামলা” ধরনের শিরোনাম। সংবাদপত্রের পাতায় পরিবেশ ছিল অনেকটা “সফট বিট”; প্রাণী ছিল বিপদের উৎস, আর মানুষ ছিল সংবাদকাহিনির একমাত্র কেন্দ্রীয় চরিত্র। কিন্তু বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও পরিবেশ বিপর্যয় সাংবাদিকতার সেই পুরোনো ভাষা বদলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, মানুষই কি সবসময় ভুক্তভোগী, নাকি অনেক সময় মানুষই অন্য প্রাণের আবাসভূমিতে অনুপ্রবেশকারী? পরিবেশ তাই আর আলাদা কোনো প্রান্তিক বিষয় নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব, নৈতিকতা ও সহাবস্থানের প্রশ্ন। এ কারণেই দ্য গার্ডিয়ান “ক্লাইমেট চেঞ্জ”-এর বদলে “ক্লাইমেট ক্রাইসিস” বলতে শুরু করেছে; কারণ শব্দও অবস্থান তৈরি করে। বিবিসি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক কিংবা নিউইয়র্ক টাইমস এখন শুধু মানুষের ক্ষয়ক্ষতি নয়, পুড়ে যাওয়া বন, বিলুপ্ত হতে থাকা প্রজাতি ও আবাস হারানো প্রাণিকুলের গল্পও গুরুত্ব দিয়ে বলে। নিউ মিডিয়ার যুগে পরিবেশ সাংবাদিকতা তাই শুধু তথ্য পরিবেশন নয়; এটি মানুষকেন্দ্রিকতা থেকে জীবকেন্দ্রিকতার দিকে এক নৈতিক যাত্রা।
গ্রেটা থুনবার্গের জলবায়ু আন্দোলন দেখিয়েছে, ডিজিটাল যুগে পরিবেশ সাংবাদিকতা আর শুধু সংবাদপত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক জনমত তৈরির শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন। ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক কিংবা এক্সে এখন “ইকো-স্টোরিটেলিং” নতুন এক ধারায় পরিণত হয়েছে, যেখানে শুধু মানুষের ক্ষয়ক্ষতি নয়, দাবানলে পুড়ে যাওয়া বন, আহত কোয়ালা, প্লাস্টিকে আটকে পড়া সামুদ্রিক প্রাণী কিংবা বিলুপ্তির মুখে থাকা প্রজাতির গল্পও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে পরিবেশ সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে মানুষকেন্দ্রিক বয়ান থেকে সরে এসে জীববৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের এক নৈতিক ভাষা তৈরি করছে, যেখানে প্রকৃতি আর শুধু “বিষয়” নয়, বরং জীবন্ত এক অস্তিত্ব।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রকৃতি ও প্রাণিকুলকে কেবল “সম্পদ” হিসেবে নয়, বরং “অধিকারসম্পন্ন অস্তিত্ব” হিসেবে দেখার প্রবণতা। আগে সংবাদে প্রাণী ছিল ঘটনা, এখন তারা হয়ে উঠছে জীবন্ত সত্তা। আগে বন ছিল অর্থনৈতিক সম্পদ, এখন তা পৃথিবীর শ্বাসপ্রশ্বাসের অংশ।
বিশ্বজুড়ে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের নানা উদাহরণ আছে। নিউজিল্যান্ডে ওয়াংগানুই নদীকে আইনি ব্যক্তিসত্তা দেওয়া হয়েছে। ইকুয়েডরের সংবিধানে প্রকৃতির অধিকার স্বীকৃত। ভারতের উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট গঙ্গা ও যমুনাকে “জীবন্ত সত্তা” হিসেবে অভিহিত করেছিল। স্পেনের মার মেনর লেগুনও আইনি অধিকার পেয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবী ধীরে ধীরে এমন এক নৈতিক অবস্থানের দিকে যাচ্ছে, যেখানে মানুষ আর প্রকৃতির “মালিক” নয়; বরং সহাবস্থানের অংশগ্রহণকারী।
পরিবেশ সাংবাদিকতার ভেতরেও এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। এখন আর শুধু “মানুষের ক্ষতি” দিয়ে পরিবেশ সংবাদ বিচার করা হয় না; বরং প্রশ্ন ওঠে, বন হারালে প্রাণিকুলের কী ক্ষতি হচ্ছে? নদী দূষিত হলে মাছের আবাস কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে? পাহাড় কাটলে সরীসৃপ, পাখি কিংবা ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ীদের কী পরিণতি হচ্ছে?
এই জায়গাতেই “সহানুভূতি” থেকে “সমানুভূতি”র প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সহানুভূতি মানে দূর থেকে করুণা; কিন্তু সমানুভূতি মানে অন্য প্রাণের অস্তিত্বকে নিজের সমান মর্যাদায় বোঝা। আধুনিক পরিবেশ সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে সেই সমানুভূতির ভাষা তৈরি করছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জীববৈচিত্র্যময় ক্যাম্পাস এই নৈতিক প্রশ্নকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে আনে। ঘন পাহাড়ি বন, ছড়া, ঝোপঝাড় আর অরণ্যঘেরা এই ক্যাম্পাসে যখন কোনো অজগর বা সাপ ধরা পড়ে, তখন প্রায়ই সংবাদ হয়, “সাপটিকে উদ্ধার করে জঙ্গলে অবমুক্ত করা হয়েছে।” একইভাবে হরিণ উদ্ধারের পরও বলা হয়, “জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুরো ক্যাম্পাসটিই যদি তাদের স্বাভাবিক আবাসভূমি হয়, তাহলে এটিকে কতটা “উদ্ধার” বলা যাবে? এখানে পরিবেশ সাংবাদিকতার ভাষার মধ্যেই এক ধরনের মানবকেন্দ্রিক আধিপত্য কাজ করে। যেন মানুষের বসতি স্বাভাবিক, আর প্রাণীর উপস্থিতি ব্যতিক্রম। অথচ বাস্তবতা উল্টোও হতে পারে, আমরাই হয়তো তাদের আবাসভূমিতে প্রবেশ করেছি। এই নৈতিক প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভাষা শুধু তথ্য বহন করে না; ভাষা ক্ষমতার সম্পর্কও তৈরি করে।
বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সাংবাদিকতায় এখন “ইকোসেন্ট্রিক জার্নালিজম” বা প্রকৃতিকেন্দ্রিক সাংবাদিকতার ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষকে প্রকৃতির কেন্দ্র নয়, বরং বৃহত্তর জীবমণ্ডলের অংশ হিসেবে দেখা হয়। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে পরিবেশ সংবাদে এখন প্রাণিকুলের আবাস ধ্বংস, অভিবাসন সংকট, এমনকি “ইকোলজিক্যাল গ্রিফ” নিয়েও লেখা হচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ শুধু নিজের ক্ষতির জন্য নয়, প্রকৃতির ক্ষতির জন্যও শোক প্রকাশ করতে শিখছে।
বাংলাদেশের পরিবেশ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন জরুরি। কারণ আমাদের সংবাদমাধ্যমে এখনো পরিবেশকে অনেক সময় উন্নয়নবিরোধী “রোমান্টিক” বিষয় হিসেবে দেখা হয়। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্য সংকট, সবকিছুই এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় পরিবেশ সাংবাদিকতার দায়িত্ব শুধু তথ্য দেওয়া নয়; বরং মানুষকে নতুন নৈতিক বোধের দিকে নিয়ে যাওয়া। এমন এক বোধ, যেখানে সাপকে শুধু ভয় নয়, বাস্তুতন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখা হবে। যেখানে হরিণ শুধু “বন্যপ্রাণী” নয়, বরং এই ভূখণ্ডের প্রাচীন বাসিন্দা। যেখানে বন শুধু কাঠের উৎস নয়, বরং নীরব এক জীবন্ত সভ্যতা।
আজ বিশ্বের বড় বড় সংবাদমাধ্যমগুলোও পরিবেশ সাংবাদিকতার ভাষা বদলে ফেলছে। বিবিসি তাদের “Planet” কাভারেজে শুধু মানুষ নয়, প্রাণিকুলের অস্তিত্ব সংকটকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ান “climate emergency” শব্দ ব্যবহার শুরু করেছে, কারণ তারা মনে করেছে “climate change” শব্দটি বিপর্যয়ের গভীরতা যথেষ্ট বোঝায় না। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক কিংবা নিউইয়র্ক টাইমসের পরিবেশ প্রতিবেদনে এখন একটি বন ধ্বংসের খবর শুধু গাছ কাটার অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; বরং পাখির অভিবাসন, প্রাণীর আবাস হারানো, এমনকি নীরব হয়ে যাওয়া একটি বাস্তুতন্ত্রের গল্প হিসেবেও উঠে আসে।
২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে প্রায় ৩০০ কোটির বেশি প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে গবেষণায় উঠে আসে। সেই সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো শুধু মানুষের ক্ষয়ক্ষতি নয়, পুড়ে যাওয়া কোয়ালা, ক্যাঙ্গারু আর পাখিদের ছবিকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছিল। কারণ পৃথিবী বুঝতে শুরু করেছে, পরিবেশ বিপর্যয় মানে শুধু মানুষের সংকট নয়; এটি সমগ্র প্রাণিজগতের সংকট।
বাংলাদেশের পরিবেশ সাংবাদিকতাকেও এখন সেই জায়গায় পৌঁছাতে হবে। “সাপ উদ্ধার”, “হরিণ উদ্ধার” কিংবা “বন্যপ্রাণী আতঙ্ক” ধরনের ভাষার বাইরে এসে আমাদের হয়তো নতুনভাবে প্রশ্ন করতে হবে, প্রাণীগুলো আসলে কার ভূখণ্ডে ছিল? কে কাকে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে? উন্নয়নের ভাষা কি শুধু মানুষের জন্য, নাকি প্রকৃতিরও অধিকার আছে সেখানে?
পরিবেশ সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ সম্ভবত এখানেই, মানুষকে প্রকৃতির মালিক নয়, সহাবস্থানের অংশ হিসেবে দেখা। কারণ শেষ পর্যন্ত পৃথিবী টিকে থাকবে পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর, আধিপত্যের ওপর নয়।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, সাবেক পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিক।




