লোডশেডিং গিলে খাচ্ছে শ্রমিকের আয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিকাল ৫টা। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার কড়ইতলা গ্রামের একটি তাঁতঘর জুড়ে অস্বাভাবিক নীরবতা। অস্বাভাবিক বলছি এ কারণে, সাধারণত বিকালটা ভীষণ ব্যস্ত কাটে শ্রমিকদের। তাঁতের ‘খটাখট’ শব্দে মুখর থাকে ঘর।
সারি সারি থেমে থাকা মেশিনের একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রমিক তাইজুল ইসলাম। মুখে ক্লান্তি, চোখে অনিশ্চয়তা। কথা বলতেই জমে থাকা হতাশা যেন এক নিঃশ্বাসে বেরিয়ে এলো।
‘তিন সপ্তাহ ধরে ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাই না। দিনে কয়বার যে যায়, হিসাব নাই। কাজ করতে না পারলে আয় নাই। সামনে ঈদ—কেমনে চলব?’
চাল কিনলে তরকারি কেনার টাকা থাকে না। বাজারে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। আমরা খাব কী ?
এ প্রশ্ন শুধু তাইজুলের নয়, বরং আড়াইহাজার উপজেলার কড়ইতলা, দাইরাদীসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজারো তাঁতশ্রমিকের। দেশ জুড়ে চলা তীব্র লোডশেডিংয়ে থেমে গেছে যাদের কাজ। বিদ্যুৎনির্ভর এ শিল্পে কাজের সময় কমে যাওয়ায় আয় কমেছে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের। ঈদের আগে বাড়তি আয়ের বদলে তাদের জীবনে এখন শুধু অনিশ্চয়তা।
এর মধ্যে চরম সংকটে পড়েছেন তাইজুল। পাঁচ সদস্যের পরিবার তার। গত সপ্তাহে তার আয় হয়েছে মাত্র ২ হাজার টাকা। এই টাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব।
তিনি বলেছেন, ‘চাল কিনলে তরকারি কেনার টাকা থাকে না। বাজারে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। আমরা খাব কী ?
দিনের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না বলে জানালেন আরেক শ্রমিক শাহিন হাসান। তিনি বলছিলেন, ‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পাঁচবার বিদ্যুৎ গেছে। একটানা এক ঘণ্টাও কাজ করতে পারিনি। ১০টা মেশিন চালিয়ে মাত্র ৫০ গজ কাপড় বোনা গেছে, আয় হয়েছে ১৫০ টাকা।’
তিন সপ্তাহ ধরে ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাই না। দিনে কয়বার যে যায়, হিসাব নাই। কাজ করতে না পারলে আয় নাই। সামনে ঈদ— কেমনে চলব?
সাধারণত দিনে একজন শ্রমিক সর্বোচ্চ ১০টি মেশিন চালাতে পারেন। এসব মেশিনে প্রতি গজ কাপড় বুনে পান ৩ টাকা। ফলে বিদ্যুৎ না থাকলে তাদের আয় সরাসরি শূন্যে নেমে যায়। আগে যেখানে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করা যেত, এখন তা ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বা তার চেয়ে নিচে নেমে এসেছে। স্বাভাবিকভাবে দৈনিক আয়ও কমে গেছে।
শুধু শ্রমিকরা নন, কারখানা মালিক ও ব্যবস্থাপকরাও পড়েছেন সংকটে। স্থানীয় একটি তাঁত কারখানার ব্যবস্থাপক রাহাত হোসাইন বললেন, ‘লোডশেডিংয়ের আগে সপ্তাহে ৫০ হাজার গজ কাপড় উৎপাদন হতো। এখন তা ৩৫ হাজার গজে নেমে এসেছে। প্রতি গজে ৩ টাকা লাভ হিসাব করলেও প্রায় ৪০ হাজার টাকার ক্ষতি হচ্ছে।’
বড় কারখানাগুলোর ক্ষতি আরও বেশি। মাস শেষে হয়তো তাদের ক্ষতির পরিমাণ ছাড়াবে কয়েক লাখ টাকা।
মালিকরা বলছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। কীভাবে সামনের দিনগুলো সামাল দেবেন, সেটাই এখন তাদের মূল ভাবনা।
ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে।
লোডশেডিংয়ের আগে সপ্তাহে ৫০ হাজার গজ কাপড় উৎপাদন হতো। এখন তা ৩৫ হাজার গজে নেমে এসেছে। প্রতি গজে ৩ টাকা লাভ হিসাব করলেও প্রায় ৪০ হাজার টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গ্যাসস্বল্পতায় ১৩টি, জ্বালানি তেলের অভাবে ৯টি এবং রক্ষণাবেক্ষণে ৮টি বন্ধ রয়েছে। ১৭টি সৌরকেন্দ্র রাতে অকার্যকর। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, আসন্ন গ্রীষ্মে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ মেগাওয়াট। ভরা গ্রীষ্মে যদি উৎপাদন না বাড়ানো যায়, তাহলে ঘাটতি আরও তীব্র হবে।
এ পরিস্থিতিতে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা হয় তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন শ্রেণির কয়েকজন মানুষের সঙ্গে। তারা বলছেন, এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ এ শিল্পের সঙ্গে সুতা সরবরাহকারী, পরিবহন শ্রমিক, পাইকারি ব্যবসায়ীসহ জড়িত একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র।
আয় কমে যাওয়ায় অনেক শ্রমিকই ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। তবে এভাবে কতদিন চালানো সম্ভব, সেটিই এখন দুশ্চিন্তার।
তাইজুল ইসলাম বলেছেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে আমরা টিকে থাকতে পারব না। বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের কোনো আয় নেই। লোডশেডিং শুধু তাঁত নয়, আমাদের জীবনটাই যেন বন্ধ করে দিচ্ছে।’
শ্রমিকদের আয় কতটা কমেছে তার ধারণা মেলে সানাউল্লাহ নামে এক শ্রমিকের কথায়। তিনি জানালেন, আগে রাতে কাজ করে সপ্তাহে প্রায় ৯ হাজার টাকা আয় করতেন। এখন তা কমে ৪ হাজার টাকায় নেমেছে। দিনে যেখানে আগে আয় হতো ৩ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা, সেটি কমে দাঁড়িয়েছে দেড় হাজারে।
এভাবে চলতে থাকলে আমরা টিকতে পারব না। বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের কোনো আয় নেই। লোডশেডিং শুধু তাঁত নয়, আমাদের জীবনটাই যেন বন্ধ করে দিচ্ছে।
অনিক টেক্সটাইল মিলের মালিক ঈসাদুল্লাহও জানালেন, উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসার কথা। তার কারখানার ১৪টি মেশিনে সপ্তাহে সাড়ে ৯ হাজার গজ কাপড় বোনা হতো। সেটি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজারে।
সাধারণত কোরবানির ঈদের আগে তাঁতশিল্পে কাজের চাপ বাড়ে, ফলে শ্রমিকদের আয়ও বাড়ে; কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এ অবস্থায় মালিক-শ্রমিকদের দাবি, অন্তত তাঁতশিল্প এলাকাগুলোয় হলেও বাড়তি সময় বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা। কারণ তাঁতের চাকা ঘুরলেই চলবে তাদের সংসার, ঘুচবে অভাব।
শিল্প ও আবাসিক খাতের মধ্যে বিদ্যুৎ বণ্টনে সমন্বিত পরিকল্পনার ওপরই জোর দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক আল আমীন।
তিনি বললেন, ‘দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন তেলনির্ভর হলেও কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পুরো সক্ষমতায় চলছে না। চাহিদা স্থিতিশীল বা কিছু ক্ষেত্রে বাড়ছে। শিল্প ও আবাসিক খাতের মধ্যে বিদ্যুৎ বণ্টনে সমন্বিত পরিকল্পনা ও নীতিগত পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ঘাটতি কমানো সম্ভব।’

