বই দিবস
বইয়ের বাজার পড়ছে নিজেদের দায়েই

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
ভাষাশহীদদের প্রতি সম্মান রেখেই বছর বছর বসে অমর একুশে বইমেলা। পৃথিবীতে সম্ভবত মাসজুড়ে বইমেলার নজির বাংলাদেশেই। বলা হয়, এ মাসেই সবচেয়ে বেশি বই বিক্রি। সারা বছর থাকে অন্ধকারে। অন্যান্য দেশে মাস জুড়ে বইমেলার নজির নেই। তবে ওইসব দেশে সারা বছরই বিক্রির খবর জানে সবাই। আমাদের দেশেও যে বছর জুড়ে বই বিক্রি হয় না, তেমনটি নয়। কিন্তু তুলনা করলে তা বলার মতো কিছুই না। বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে যেসব উদ্যোগ দরকার, তেমন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না সরকারি-বেসরকারি কোনো পক্ষ থেকেই।
সব বাদ দিয়ে যদি এমন কাঠখোট্টা প্রশ্নও করা যায়- বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা কত? তার সঠিক উত্তর মেলা ভার। আবার বছরে কত টাকার বই বিক্রি হয়, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। যেটুকু পাওয়া যায়, তাও মেলাকেন্দ্রিক তথ্য; যেমন সর্বশেষ বইমেলায় বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৭ কোটি টাকার বই। অন্য আসরে যে শতকোটির কাছাকাছি বিক্রির নজির নেই, তা নয়।
প্রযুক্তির এ যুগে মানুষ ইন্টারনেটে সময় দিচ্ছেন বেশি, নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাচ্ছেন। ছাপা বইয়ের বদলে পড়ছেন পিডিএফ। বইয়ের বাজার কমে যাওয়ার জন্য এগুলোই কি কারণ, নাকি এর দায় সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকদেরই?
বাংলাদেশের সৃজনশীল বইয়ের বাজার মূলত অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন বই বিপণন সংস্থা এবং অমর একুশে বইমেলাকেন্দ্রিক। তা ছাড়া প্রকাশনা সংস্থাগুলোও সারা বছর অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করে বই।
তবে সব মিলিয়ে বছরে কত টাকার বই বিক্রি হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না কোনো পক্ষ থেকেই। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার তথ্যেও আছে ভিন্নতা।
প্রকাশনা সংস্থা প্রথমার উপব্যবস্থাপক কাউসার আহম্মেদ আশিকের ধারণা, বাংলাদেশে বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো সৃজনশীল বই বিক্রি হয়। তার ধারণার সঙ্গে একমত গ্রন্থিকের প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির বইমেলা স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক আবুল বাশার ফিরোজ এবং সদস্য-সচিব মনিরুজ্জামান খানও।
আগামীর সময়কে তাদের দেওয়া তথ্যের সারকথা- সারা বছরের সব প্রকাশনা সংস্থার নিজস্ব বিক্রি এবং বিভিন্ন অনলাইন বই বিপণন কেন্দ্রের বিক্রি যোগ করলে সেটি ১ হাজার ২০০ কোটি থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো হতে পারে।
অবশ্য প্রকাশনা সংস্থা ও চেইন বুকশপ বাতিঘরের স্বত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশ মনে করেন, বই ১ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে। তবে সেটি দেড় হাজার কোটি টাকা হবে কি না, তা নিয়ে তিনি কিছুটা সন্দিহান।
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির বইমেলা স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য সচিব মনিরুজ্জামান খানের সহজ স্বীকারোক্তি, ‘বইয়ের বাজার কত টাকার, তা নিয়ে আমাদের কাছে কোনো স্বীকৃত পরিসংখ্যান নেই।’
অবশ্য সমিতি থেকে এ রকম একটি পরিসংখ্যান তৈরির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে বলে জানালেন তিনি।
বই নিয়ে কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক এ এইচ এম সাখাওয়াত উল্লাহর অভিমত, বই বিক্রির বাজার, পাঠকের রুচি এবং সৃজনশীল বই নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণা হওয়া উচিত। তিনি আশ্বাস দিলেন, আগামী অর্থবছরে গবেষণা খাতে তারা কিছু পরিকল্পনা করেছেন।
প্রকাশনা সংস্থা আছে ৭ শতাধিক
২০২৫ সালে বইমেলায় অংশগ্রহণ করে ৭২১টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৭০৩টি ছিল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, বাকিগুলো ছিল মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান। সে হিসেবে দেশে ৭ শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। সবশেষ বইমেলায় অংশ নেয় ৫৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি বলছে, তাদের সদস্যভুক্ত প্রকাশনা সংস্থা আছে আড়াইশর মতো। অন্যদিকে ৩ শতাধিক সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা নিয়ে গত বছর বইমেলার আগে প্রকাশ্যে আসে প্রকাশক ঐক্য।
এ ছাড়া দেশে ৪ শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা আছে, এগুলো মূলত একুশে বইমেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশ এবং করে থাকে বিপণন।
বিক্রিতে কভিডের ধাক্কা
২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলায় অংশ নেওয়া ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ ১৭ কোটি টাকার মতো বলে জানিয়েছে মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। তবে এই তথ্য কোনো গবেষণাভিত্তিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না হওয়ায় কেউ কেউ ‘মনগড়া’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বইমেলায় বাংলা একাডেমির দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করেছে আগামীর সময়। এতে দেখা যায়, কোভিডের আগে বই বিক্রি প্রতি বছরই ছিল ঊর্ধ্বমুখী, কোভিডের পর থেকে হতে থাকে নিম্নমুখী। কোভিডের আগে মেলায় শতকোটি টাকার বই বিক্রির হাতছানি থাকলেও, বর্তমানে তা নেমেছে ১৭ কোটিতে।
২০২৫ সালে মাসব্যাপী বইমেলায় অংশ নেওয়া অর্ধেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রির তথ্য দিয়ে মেলা কমিটি জানিয়েছিল, বই বিক্রি হয়েছে ২০ কোটি টাকার মতো। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি মিলিয়ে আনুমানিক ৪০ কোটি টাকার বই বিক্রির তথ্য এক বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরেছিল মেলা পরিচালনা কমিটি। এর আগে ২০২৪ সালে মেলায় বিক্রি হয়েছিল ৬০ কোটি টাকার বই। ২০২৩ সালে বিক্রি হয়েছিল ৪৭ কোটি টাকার বই।
২০১৩ সাল থেকে মেলাকেন্দ্রিক বই বিক্রির তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৩ সালে বই বিক্রি হয়েছে ১০ কোটি ১৪ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে সাড়ে ১৬ কোটি, ২০১৫ সালে ২১ কোটি ৯৫ লাখ, ২০১৬ সালে ৪০ কোটি ৫০ লাখ ও ২০১৭ সালে ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে যা ছিল ৭০ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০১৯ সালে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৮০ কোটি টাকা। ২০২০ সালে বিক্রি হয় ৮২ কোটি টাকা।
সবশেষ বইমেলা নিয়ে সৃজনশীল প্রকাশকদের সংগঠন প্রকাশক ঐক্যের ভাষ্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালে বইমেলায় বিক্রি কমেছিল ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ। কিন্তু এবারের বইমেলার পরিস্থিতি ২০২১ সালের কোভিডকালে মেলার চেয়েও ‘শোচনীয়’।
২০২৬-এর মেলার পর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশক ঐক্য দাবি করে, অংশগ্রহণকারী ‘প্রায় ৯০ শতাংশ’ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের ‘প্রাথমিক খরচটুকুও ওঠেনি’, যার মধ্যে ‘প্রায় ৩০ শতাংশ’ প্রকাশকের ‘৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি’।
বাতিঘরের স্বত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশের দাবি, ‘কভিডের সময় বড় ধাক্কা খেয়েছে সৃজনশীল বইয়ের বাজার। সেখান থেকে বছরব্যাপী যে বিক্রি, তা কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছে, তবে বইমেলাকেন্দ্রিক বিক্রি নানা জটিলতায় এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।’
বইয়ের বাজার নিয়ে প্রকাশক ঐক্যের ভাষ্য, ‘১৮ কোটি মানুষের এই দেশে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি বই বিক্রি করার স্বপ্ন কোনো অবান্তর কল্পনা নয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার একটি সুনির্দিষ্ট মার্কেটিং বাজেট থাকলে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।’



