উদীচীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : লড়াই অব্যাহত রাখার প্রত্যয়

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দুই অংশ পৃথক আয়োজনে ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। একটি অংশ রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির আয়োজন করেছে। অন্য অংশের উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হচ্ছে সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) এবং ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির ২৩তম জাতীয় সম্মেলনে কমিটি ঘোষণা নিয়ে বিরোধের জেরে উদীচী বিভক্ত হয়ে পড়ে। দুই পক্ষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পৃথক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে দুই কমিটিই উদীচীর ব্যানারে পৃথক কর্মসূচি পালন করে আসছে।
১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠার পর থেকে গান, কবিতা, নাটক ও নৃত্যসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামাজিক অসংগতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আসছে উদীচী। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা আরও জোরদার করার প্রত্যয় জানিয়েছেন।
‘কোনো কিছুই উদীচীকে থামাতে পারবে না’
কোনো ধরনের বাধা দিয়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন থামানো যাবে না বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সংগঠনটির একাংশের নেতারা। তাদের মতে, দীর্ঘ পথচলায় হামলা, হত্যা ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অঙ্গীকার থেকে সরে যায়নি উদীচী।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বর্ণাঢ্য আয়োজনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নেব’ স্লোগান সামনে রেখে বিকেল ৪টায় শুরু হয় অনুষ্ঠান। জাতীয় সংগীত ও সংগঠন সংগীতের মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকা এবং উদীচীর পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসূচির প্রথম পর্ব শুরু হয়।
জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন বাউলশিল্পী শেখ জামাল উদ্দিন (টুনটুন ফকির) এবং সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবীবুল আলম। অনুষ্ঠানে উদীচীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আবৃত্তিকার বদরুল আহসান খান এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সংগীতদলের সদস্য তাজিম সুলতানাকে সম্মাননা জানানো হয়।
আলোচনা পর্বে উদীচীর কেন্দ্রীয় সংসদের (একাংশ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলমের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন বাউলশিল্পী শেখ জামাল উদ্দীন (টুনটুন ফকির), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফি রতন, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, লেখক ও গবেষক জাকির হোসেন, লেখক ও গবেষক সুতপা বেদজ্ঞ, উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এবং ঢাকা মহানগর সংসদের সাধারণ সম্পাদক রুমি দে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান।
অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন অনন্যা লাবণী পুতুল ও মাহমুদুল হাসান। অনন্দিতা খানের পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্য সংগঠন ‘অংশী’। বাউল গান পরিবেশন করেন টুনটুন ফকির। দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন ফারহান এহসান আবৃতা, মায়েশা সুলতানা উর্বি, উদীচীর কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের শিল্পীরা এবং তাজিম সুলতানার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠাকালীন ও বর্তমান সময়ের সংগীতদলের সদস্যরা।
কাল রবীন্দ্র সরোবরে আয়োজন
‘সংগ্রাম শুরু করো মুক্তির, দিন নেই তর্ক ও যুক্তির’ স্লোগান সামনে রেখে বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সামনের সড়কে শুরু হয় উদীচীর অপর অংশের অনুষ্ঠানমালা। উদ্বোধন করেন উদীচীর পতাকার রূপকার শিল্পী আনোয়ার হোসেন। এ সময় জাতীয় সংগীত, সংগঠন সংগীত ও একটি গণসংগীত পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া বাচিক শিল্পীরা বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করেন। তারা ‘শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা’ শিরোনামে একটি স্ক্রিপ্ট উপস্থাপন করেন। এটি গ্রন্থনা করেছেন রিপন আচার্য শিশির এবং নির্দেশনা দিয়েছেন শিখা সেন গুপ্তা। সঞ্চালনা করেন সঙ্গীতা ইমাম।
বিকাল ৫টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের শতবর্ষ উপলক্ষে সেমিনার শুরু হয়। একশ বছর আগে বাঙালি মুসলিম সমাজকে প্রগতিশীল চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে রেনেসাঁর মতো ভূমিকা রাখা এ আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্টজনরা।
উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের (একাংশ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিমের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা একাডেমির গবেষক ও লেখক মামুন সিদ্দিকী। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, অধ্যাপক এম. এম. আকাশ এবং উদীচী একাংশের ঢাকা মহানগর সংসদের সভাপতি অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকী। সেমিনার সঞ্চালনা করেন অমিত রঞ্জন দে।
দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার দ্বিতীয় দিন শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে শুরু হবে উদীচীর নবীন-প্রবীণ কর্মীদের পুনর্মিলনী। এরপর বিকাল ৫টা থেকে থাকবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সেখানে পরিবেশিত হবে গীতি-আলেখ্য ‘উদীচী, প্রগতির পদাতিক’। এটি গ্রন্থনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন মাহমুদ সেলিম।
অনুষ্ঠানে দেশবরেণ্য শিল্পীদের একক ও সমবেত গান, আবৃত্তি এবং নৃত্য পরিবেশনা থাকবে। এ ছাড়া পারিবারিক সফরে বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তরুণ শিল্পী আরাত্রিকা সিনহাও উদীচীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে গান পরিবেশন করবেন।



