অসাম্প্রদায়িক ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবিচল থাকার প্রত্যয় উদীচীর

ছবি: আগামীর সময়
লড়াই-সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে পুনর্মিলনী, আলোচনা সভা ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ২৯ ও ৩০ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী এ আয়োজন করে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ একাংশ। তাদের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল—’সংগ্রাম শুরু করো মুক্তির, দিন নেই তর্ক ও যুক্তির।’
অনুষ্ঠানে ছায়ানট সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে থেকে উদীচী ও ছায়ানট যে অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে, তা এখনো সম্পন্ন হয়নি। অন্ধকারের অপশক্তি বারবার এই দুই সংগঠনের ওপর আঘাত হেনেছে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরেও উদীচী ও ছায়ানটের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। কিন্তু এত প্রতিকূলতার পরও উদীচী থেমে থাকেনি, ভবিষ্যতেও থেমে থাকবে না।’
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মাহীর শাহরিয়ার রেজা বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এ দেশের মাটিতে একজন মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়া হয়। স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক শক্তি কে প্রকৃত আর কে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, তা নির্ধারণের দুঃসাহস দেখায়।’ এই অন্ধকার সময় অতিক্রম করে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী বলেন, ‘উদীচী জন্মলগ্ন থেকেই যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে লড়াই-সংগ্রাম করে আসছে, সেই আদর্শিক সংগ্রাম থেকে কখনো পিছপা হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।’
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী একাংশের সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে গঠিত উদীচী স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক পটভূমি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক, শোষণহীন ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। যত বাধাই আসুক, উদীচী তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে না। জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা ও দেশের স্বাধীন সার্বভৌমত্বকে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষায় উদীচীর শিল্পীরা আমৃত্যু কাজ করে যাবেন।’
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী একাংশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি ও বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি উদীচী গঠনতান্ত্রিকভাবেই দায়বদ্ধ। উদীচী সবসময় নতুন যৌবনের দূত হিসেবে দেশের সংকটময় মুহূর্তে মানুষকে সঠিক দিশা দেখানোর চেষ্টা করে যাবে। ধ্রুবতারার মতোই উদীচী প্রগতির মশাল জ্বালিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে।’
আরও বক্তব্য দেন খান আসাদুজ্জামান মাসুম, প্রণয় সাহা, রেজাউল করিম সিদ্দিক রানাসহ অনেকে। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রবীর সরদার। আলোচনা। সঞ্চালনা করেন প্রদীপ ঘোষ।
আলোচনা পর্বের আগে উদীচীর বিভিন্ন পর্যায়ের শিল্পী, সংগঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় পুনর্মিলনী। এরপর মাহমুদ সেলিমের গ্রন্থনা ও নির্দেশনায় পরিবেশিত হয় সাংস্কৃতিক প্রযোজনা ‘প্রগতির পদাতিক’।
অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে শান্ত-মারিয়াম ড্যান্স একাডেমি। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শিরিন ইসলাম, বেলায়েত হোসেন, সৌম্য শেখর সিনহা ও দিগন্ত সিনহা। একক সংগীত পরিবেশন করেন অর্জুন বিশ্বাস, আরাত্রিকা সিনহা, অরুনিমা আহমেদ প্রথমা, শাওন কুমার রায় ও সুমন চক্রবর্তী।
এ ছাড়া বেলায়েত হোসেনের গ্রন্থনায় এবং শিখা সেনগুপ্তার নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় ‘আমার মাটি আমার মোহনা’ শীর্ষক আবৃত্তি। সম্মেলক আবৃত্তি পরিবেশন করে কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র। সবশেষে উদীচীর ঐতিহ্যবাহী সংগঠন সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ২৩তম জাতীয় সম্মেলনে কমিটি ঘোষণা নিয়ে বিরোধের জেরে উদীচী বিভক্ত হয়ে পড়ে। দুই পক্ষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পৃথক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে দুই কমিটিই উদীচীর ব্যানারে পৃথক কর্মসূচি পালন করে আসছে।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দুই অংশ এবার পৃথক আয়োজনে ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে। একটি অংশ রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির আয়োজন করেছে। অন্য অংশের উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হয় সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) এবং ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে।
১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠার পর থেকে গান, কবিতা, নাটক ও নৃত্যসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামাজিক অসংগতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আসছে উদীচী।



