৭০ বছরের পুরনো আলাউদ্দিন খাঁ সংগীত কলেজ কোথায় হারাল?
- সংগীতাঙ্গনের জমি দখলে মামলা, পুনর্বিচারের নির্দেশ
- দুই দফায় আগুন, মুছে যাচ্ছে সুরসম্রাটের স্মৃতিচিহ্ন

সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন। ছবি: আগামীর সময়
পঞ্চাশের দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুরাতন জেলরোডে একটি বাড়ি কিনেছিলেন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। তার ইচ্ছা ছিল এই বাড়িতে একটি সংগীত কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন। ১৯৫৬ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠা পায় ‘আলাউদ্দিন খাঁ মিউজিক্যাল কলেজ’, যা পরে নাম পরিবর্তন করে ‘দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন’ রূপ ধারণ করে। তবে সুরসম্রাটের সেই স্বপ্নের কলেজটি একপর্যায়ে হারিয়ে যায়। কেউ কেউ মনে করেন এটিই ছিল দেশের প্রথম সংগীত কলেজ।
ছয় দশকের পর সংগীতাঙ্গনটির জমির মালিকানা দাবি করে মামলা হওয়ায় বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে গত মঙ্গলবার ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আলমগীর মুহাম্মদ ফারুকীর আদেশে মামলাটি নতুন রূপ পেয়েছে, যা এই সংগীত প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব রক্ষায় ইতিবাচক বলে মনে করছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকে।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে ‘হেম-বেহাগের মহারাজা’ নামে উপন্যাস লিখেছেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও গবেষক নাসির আলী মামুন। তিনি বলেছেন, ‘এখনো দেশে-বিদেশে আলাউদ্দিন খাঁর অনেক মূল্যবান স্মারক, তার ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সেগুলো সংগ্রহ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা বড় পরিসরে জাদুঘর করা ভীষণ জরুরি।’
আলাউদ্দিন খাঁর নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংগীত কলেজটিও ফেরানোর দাবি জানান নাসির আলী মামুন।
আলাউদ্দিন খাঁর ভাই আয়েত আলী খাঁ নিয়মিত মিউজিক্যাল কলেজে সংগীত শিক্ষা দিতেন। আয়েত আলী খাঁর মৃত্যুর পর কলেজটির গতি কমে যায়। স্বাধীনতার পর আলাউদ্দিন খাঁর ছেলে আলী আকবর খাঁর অনুরোধে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তৎকালীন জেলা প্রশাসক তোফায়েল আহমেদকে প্রতিষ্ঠানটি সংস্কারের ব্যবস্থা করতে বলেন। এরপর সীমানা প্রাচীর নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে ‘আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন’ নামে এর নবযাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৭৭ সালে আলী আকবর খাঁ নিজে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসে মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংগীতাঙ্গনের অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র পরিবেশন করেছিলেন।
২০১৬ এবং ২০২১ সালে দুই দফা নাশকতামূলক অগ্নিকাণ্ডে সংগীতাঙ্গনে সংরক্ষিত আলাউদ্দিন খাঁর ঐতিহাসিক সরোদ, বেহালা, সন্তুর, এস্রাজ, সৌদি আরবের বাদশাহর দেওয়া জায়নামাজ ও মাইহার রাজার দেওয়া গালিচাসহ বহু অমূল্য স্মৃতিচিহ্ন ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
সংগীতাঙ্গনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল আলম বলেছেন, ‘সরকারিভাবে সংগীতাঙ্গনের জায়গায় একটি ছয়তলা কমপ্লেক্স করার পরিকল্পনা অনেক দূর এগিয়েছে।’
জমির দখল চায় কারা?
আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন শুরু থেকেই সরকারের সম্পৃক্ততায় পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৯৫৬ সালে যখন এটি চালু করা হয়, তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ছিলেন এর সভাপতি। খাঁ পরিবারের সদস্যদের অনেকেও বিভিন্ন সময় পরিচালনা কমিটিতে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে পদাধিকারবলে ‘সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন’ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক।
শহরের হালদারপাড়ার খুরশেদ মিয়া খাঁ ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বড় মেয়ে সরোজা বেগমের ছেলে মিজানুর রহমান, মুজিবুর রহমান, হাবিবুর রহমান ও সেলিম মিয়া একটি দানপত্র দলিলমূলে ২০২০ সালের ১০ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল আদালতে বিএস খতিয়ান সংশোধনের একটি মামলা করেন।
মামলার আরজিতে বাদীপক্ষ দাবি করে, আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের বিভিন্ন দাগের সাড়ে ৪৯ শতক জমির মধ্যে ৮ শতক জায়গা তাদের দখলে আছে। তারা সংগীতাঙ্গনের ভেতরে ঘর তৈরি ও পুকুরে মাছ চাষ করে ৮ শতাংশ জায়গা ভোগদখল করছে।
তবে সরেজমিন দেখা গেছে, সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে আটটি কক্ষ ও একটি মিলনায়তন আছে। এর মধ্যে একটি কক্ষে একটি জাদুঘর রয়েছে। সংগীতাঙ্গনের ভেতরে কোনো পরিবারের বসবাসের অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত সংগীত, নাচসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র শেখানোর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
জমি দখলে মামলা, পুনর্বিচারের নির্দেশ
আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের জমি দখলসংক্রান্ত বিরোধে করা আপিলটি মঙ্গলবার মঞ্জুর করেছেন ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে (ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল) পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী মো. মাছুম বলেন, উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।
আপিলকারীর পক্ষে জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) সিরাজুল ইসলাম আবিদ বলেছেন, ‘আদালতের সুবিবেচনাপ্রসূত এই রায়ে আমরা আনন্দিত। পুনর্বিচারের আদেশের ফলে নিম্ন আদালতের একতরফা রায় রদ হয়েছে। আমরা নিম্ন আদালতে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করতে সক্ষম হব যে, নালিশা ভূমিতে প্রতিপক্ষের দাবি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।’
পরিবার কী বলছে?
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সরোজা বেগমই জীবিত থাকাকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকতেন। অন্য দুই মেয়ে এবং ছেলের বংশধররা ভারতের মাইহার, কলকাতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। চার প্রজন্মে তাদের অন্তত ৮০ জনের মতো বংশধর দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছেন।
আলাউদ্দিন খাঁর ভাতিজা সুরকার ও সংগীতজ্ঞ শেখ সাদী খানের দাবি, আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের জমি তাঁদের পারিবারিক সম্পত্তি। এজন্য জমির মালিকানা দাবি করে বিভিন্ন সময় তিনি সংবাদমাধ্যমে বক্তব্যও দিয়েছেন। রায়ের প্রতিক্রিয়া জানতে শেখ সাদী খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেছেন, এখনো রায়ের বিস্তারিত তিনি শোনেননি। পুরো বিষয়টি জেনে পরে প্রতিক্রিয়া জানাবেন।
এদিকে এই জমির মালিকানা দাবি করেননি আলাউদ্দিন খাঁর প্রপৌত্র সিরাজ আলী খান, যিনি বর্তমানে ভারতে বসবাস করছেন। এই প্রতিবেদককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এর আগে তিনি বলেছিলেন, যারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করেছেন, তাদের সঙ্গে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ভারতে বসবাসরত বংশধরদের কোনো আলোচনা বা যোগাযোগ হয়নি। সিরাজ আলী খান ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, জমিটি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের কাছেই থাকা উচিত এবং সেখানে বড় পরিসরে সংগীত কলেজ করা উচিত।
আলাউদ্দিন খাঁ কী চেয়েছিলেন?
আলাউদ্দিন খাঁ জীবদ্দশায় নিজের জমি ‘দেবোত্তর’ করতে চেয়েছিলেন। সেই ইচ্ছার কথা তার একটি চিঠিতে পাওয়া যায়। ১৯৫৪ সালে আলাউদ্দিন খাঁ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসেছিলেন। সে সময় তিনি শিবপুরের বাড়িতে বাবা-মায়ের কবর পাকা করার পাশাপাশি একটি মসজিদ নির্মাণের কাজ করেছিলেন। মাইহারে আলাউদ্দিন খাঁর সহকারী এবং শিষ্য ছিলেন যতীন ভট্টাচার্য; যিনি সরোদ বাদক ও সংগীতজ্ঞ হিসেবে পরিচিত।
১৯৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর শিবপুর থেকে আলাউদ্দিন খাঁ যতীন ভট্টাচার্যকে লেখেন, ‘মসজিদের কার্য্য সারিতে আর ১ মাস লাগিবে, এই সঙ্গে পিতামাতার কবরস্থান পাকা করা আরম্ভ হয়ে গেছে। এরপর সম্পত্তি যা আছে তাহা দেবোত্তর করিতে হবে। তারপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাটিতে আলাউদ্দিন সংগীত কলেজ স্থাপন করার বাসনা করি। তারপর শিবপুর গ্রামে মেয়েদের স্কুল খুলিবার বাসনা আছে।’







