২৭ বছর ‘অগণতান্ত্রিক’ বাংলা একাডেমি

২০১৪ সালে পাওয়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এক দশক পর ২০২৪ সালে বাংলা একাডেমির কাছে ফেরত পাঠান কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার। তিনি তখন অভিযোগ করেছিলেন, ‘সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া বাংলা একাডেমির পরিচালনা পদ্ধতিতে সচেতন মানুষ আস্থা হারিয়েছে।’ এরকম একটি প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার তার জন্য সম্মানজনক নয় উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়া বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়েও।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পরও বাংলা একাডেমিতে ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ’ ফেরেনি, হয়নি নির্বাহী পরিষদের নির্বাচন। জাকির তালুকদার সম্প্রতি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘নিয়মিত নির্বাচন না হওয়ার কারণে বাংলা একাডেমি একটি স্বেচ্ছাচারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে নিজের মেরুদণ্ড হারিয়েছে।’
১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমিতে সবশেষ নির্বাহী পরিষদের নির্বাচন হয়েছিল। অথচ স্বায়ত্তশাসিত এই প্রতিষ্ঠানটির আইন বলছে, তিন বছর পরপর এ নির্বাচন হওয়ার নিয়ম। সে হিসাবে ২৭ বছরে ৯টি নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল।
নিয়মিত নির্বাচন না হওয়ার কারণে বাংলা একাডেমিকে ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠান বলছেন সাবেক মহাপরিচালক, সাম্মানিক ফেলো এবং সদস্যদের কেউ কেউ। ১৯৯৭-২০০১ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, নির্বাচন না হলে বাংলা একাডেমি ‘গণতান্ত্রিক হয় না’।
সাবেক এই মহাপরিচালকের ভাষ্য, “একটি দেশে শুধু নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও ‘গণতান্ত্রিক’ হতে হয়। বাংলা একাডেমি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। অথচ এটি পরিচালিত হচ্ছে শুধু সরকার মনোনীতদের দ্বারা। ফলে বাংলা একাডেমি একটি ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।”
ভাষাবিদ, শিক্ষক ও গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ ২০০৭ সালের মে থেকে ২০০৯ সালের মে পর্যন্ত বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। প্রবন্ধ ও গবেষণায় ২০১৮ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও পান।
সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘বাংলা একাডেমিতে নির্বাচন হওয়াটা ভীষণ জরুরি। এখন কী কী সমস্যার জন্য নির্বাচন হচ্ছে না, তা তো বলতে পারব না। তবে আমি যখন ছিলাম তখন তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল ছিল। তখনো নির্বাচন হয়নি।’ নির্বাচন হওয়া জরুরি উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে যেটা হয়, কাউন্সিলে গণতান্ত্রিক একটা পরিবেশ তৈরি হয়। পুরস্কারসহ বাংলা একাডেমি নিয়ে যে ধরনের বিতর্কিত আলোচনার জন্ম হচ্ছে, তা নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরিষদ সভায় কথা বলার সুযোগ পান।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও বাংলা একাডেমিতে ফেরেনি নির্বাচনের ধারাবাহিকতা। অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান দীর্ঘসময় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী মহাপরিচালক হন। তিনি মারা গেলে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা। তিনি দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যা তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। বাংলা একাডেমির পুরস্কার নিয়েও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আসে।
বাংলা একাডেমিতে ১৯৯৯ সালে সবশেষ নির্বাচিত নির্বাহী পরিষদে ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক রামেন্দু মজুমদার, প্রতিষ্ঠানটির সাম্মানিক ফেলোও তিনি। রামেন্দু মজুমদার আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘সরকার মনোনীত সদস্যদের পাশাপাশি যখন নির্বাচিত প্রতিনিধিও বাংলা একাডেমি পরিচালনায় যুক্ত থাকেন, তখন প্রতিষ্ঠানটিতে গণতান্ত্রিক ধারা বজায় থাকে। বিভিন্ন সময় এ নিয়ে দাবি তোলার পরও বাংলা একাডেমিতে নির্বাচন হয়নি।’
বাংলা একাডেমি আইনের ২৩ নম্বর ধারার ১ নম্বর উপধারায় বলা আছে, মোট ১৯ সদস্য নিয়ে নির্বাহী পরিষদ গঠিত ও পরিচালিত হবে। ৩ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচিত সদস্যরা নির্বাচিত হওয়ার পর অনুষ্ঠিত নির্বাহী পরিষদের প্রথম সভার তারিখ থেকে তিন বছর মেয়াদের জন্য পরিষদের সদস্য হবেন। তারা দুই মেয়াদের বেশি সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না। নির্বাচনের মাধ্যমে একাডেমির ফেলোরা তিনজন ফেলো ও সাধারণ পরিষদের সদস্যরা চারজনকে নির্বাচিত করবেন। এই সাতজনই নির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য।
কিন্তু এই সাত নির্বাচিত সদস্য না থাকায় অনেক দিন ধরে নির্বাহী পরিষদ চলছে শুধু পদাধিকারবলে ও মনোনীত ১২ সদস্য দিয়ে। এই ১২ জনের মধ্যে দুজন পদাধিকারবলে সদস্য। দুজন নির্বাহী পরিষদ মনোনীত সদস্য। আর আটজন সরকার মনোনীত সদস্য। অনেক দিন ধরে এ ১২ জনই নির্বাহী পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন এবং মন্ত্রণালয় বা সরকারের হস্তক্ষেপ বেড়েছে বাংলা একাডেমিতে।
নিয়মিত নির্বাচন না হওয়ার কারণে বাংলা একাডেমি পরিচালনায় যে গণতান্ত্রিক ধারা থাকার কথা, সেটি ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমও। তবে এতে একাডেমির নিয়মিত কর্ম পরিচালনায় কোনো বিঘ্ন ঘটছে না বলে তার মত।




