ফ্লোটিলা সক্রিয়কর্মীদের প্রতিরোধ ও সংহতির গল্প

মোহাম্মদ আলী (লিয়াকত), জুবায়েদ ইসলাম খান ও শহিদুল আলম
ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে ‘ফ্লোটিলা : বাংলাদেশের গাজা অভিমুখে যাত্রা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শনিবার সন্ধ্যায় দৃক পিকচার লাইব্রেরির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় পৃথক তিনটি জাহাজে থাকা তিন ফ্লোটিলা সক্রিয়কর্মী—মোহাম্মদ আলী (লিয়াকত), জুবায়েদ ইসলাম খান ও শহিদুল আলম অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
মোহাম্মদ আলী (লিয়াকত) বলেছেন, ‘গাজায় হামলা অব্যাহত থাকা অবস্থায় শুধু প্রতিবাদ ও আবেদন জানানোকে যথেষ্ট মনে করিনি। ইসলামি বিশ্বাসের তাগিদ এবং কাজের মাধ্যমে অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান থেকেই ফ্লোটিলা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হই। বাছাইপ্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয়ে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল গঠনে সহায়তা করি।’
পরিবারকে, বিশেষ করে ঘনিষ্ঠ মাকে বিষয়টি জানানো কঠিন ছিল জানিয়ে লিয়াকত জানালেন, তার মা বাধা না দিয়ে সিদ্ধান্তে সমর্থন দেন এবং যাত্রার জন্য অর্থও দেন। মায়ের এই আশীর্বাদ তার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে।
তিনি ফ্লোটিলার নিবিড় প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন। সম্ভাব্য আটকের পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃত্রিম আটক ও নির্যাতনের মহড়াসহ সপ্তাহজুড়ে জাহাজ, ক্রু, ওষুধ ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রস্তুত করা হয়। লিয়াকত জোর দিয়ে বলেন, ‘এই মিশন কোনো ব্যক্তিগত বীরত্বের জন্য ছিল না; মিশনের কেন্দ্রে ছিল ফিলিস্তিন।’
আরেক বাংলাদেশি শহিদুল আলমও মিশনে আছেন জানতে পেরে তিনি স্বস্তি পান এবং আটকের পর তাদের দেখা হওয়ায় মানসিক শক্তি পান। তার ভাষায়, ‘এই মিশন ছিল বিশ্বাস, সংহতি ও ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের প্রকাশ।’
জুবায়েদ ইসলাম খান জানান, গাজার পরিস্থিতি নিয়ে নিজের মধ্যে তৈরি হওয়া অসহায়ত্ব একসময় অপরাধবোধে রূপ নেয়। যুক্তরাজ্যে বসবাস করায় দৈনন্দিন জীবনযাপনকে তিনি সহিংসতার সহায়ক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করতেন। সমুদ্রযাত্রাকে ঐক্যের শক্তিশালী রূপ হিসেবে স্মরণ করেন জুবায়েদ। বিভিন্ন দেশ ও ধর্মের মানুষ একসঙ্গে যাত্রা করেছিলেন। ফিলিস্তিনিদের জন্য মুসলিম ও অমুসলিমরা জীবনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত—এ দৃশ্য দেখে মানবতার প্রতি তার বিশ্বাস ফিরে আসে।
এক রাতে জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হলে তারার আলো দেখে তিনি জাহাজকে পূর্ব দিকে সচল রাখেন। মেরামতের পর কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করেন, যেখানে অন্ধকার রাতে পথপ্রদর্শক হিসেবে তারার উল্লেখ আছে। ঘটনাটি তার কাছে গভীর এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
যোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে আটকের মুহূর্তে সরাসরি সম্প্রচারের চেষ্টা করেছিলেন জুবায়েদ। ইসরায়েলি বাহিনী তাকে বাধা দেয় এবং ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষায় তিনি নিজের ফোন সমুদ্রে ফেলে দেন। আটক অবস্থায় নির্দয় পরিবেশের পাশাপাশি সক্রিয়কর্মীদের ওপর প্রহার, পোশাক খুলে নেওয়া এবং গুরুতর যৌন নিপীড়ন, হামলা ও ধর্ষণের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।
আলোচনার বড় অংশজুড়ে শহিদুল আলম একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী ও সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন। তিনি ফ্লোটিলা যাত্রার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানান, তিন বাংলাদেশি পৃথক জাহাজে যাত্রা করেছিলেন। তার জাহাজ ‘কনসায়েন্স’-এ প্রায় ৩০টি দেশের ৯২ জন সদস্য ছিলেন, যাদের বেশিরভাগই সাংবাদিক ও চিকিৎসা পেশাজীবী।
ফ্লোটিলায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নেওয়া হয়েছিল জানিয়ে শহিদুল আলম বললেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সেশনের সময় নিউইয়র্কে থাকা অবস্থায় এক বন্ধুর মাধ্যমে ফ্লোটিলা সম্পর্কে জানতে পারি। কয়েক দিনের মধ্যে ভ্রমণ পরিকল্পনা বদলে এমন এক মিশনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেখান থেকে হয়তো আর ফিরে নাও আসতে পারি। সঙ্গী রেহনুমা আহমেদ আমাকে শতভাগ সমর্থন দেন।’
দেরিতে পৌঁছালেও বাংলাদেশের পতাকা হাতে ‘কনসায়েন্স’-এ ওঠেন শহিদুল এবং সেখানে বাংলাদেশের উপস্থিতি দৃশ্যমান করেন। জাহাজের জীবন ছিল সুশৃঙ্খল, তবে কঠিন। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পাহারা ও সীমিত ঘুমানোর জায়গা সবাইকে ভাগাভাগি করে নিতে হয়েছে। শহিদুল ড্রোনে নজরদারি করেন, অন্যদিকে পেশাদার ক্রুরা সামলান সাগরের ঝুঁকি।
শহিদুল আলম জানান, এই যাত্রায় সদস্যরা নিজেদের মতামত প্রকাশ এবং ভবিষ্যতের সংহতির পরিকল্পনা করার সুযোগ পান। মিশন মাঝপথে অবরুদ্ধ হলেও এর উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি শিশুদের বোঝানো যে তারা একা নয়, ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও চিকিৎসকদের সমর্থন দেওয়া এবং গাজার ওপর বিশ্ববাসীর মনোযোগ ধরে রাখা।
তিনি আরও বলেছেন, ‘এই মিশন শুধু ত্রাণ সরবরাহের জন্য ছিল না; বরং ফিলিস্তিনিদের—বিশেষ করে শিশু, সাংবাদিক ও চিকিৎসাকর্মীদের—এটি জানানো যে তারা পরিত্যক্ত নন। পথিমধ্যে বাধাগ্রস্ত হওয়া মিশনও গাজার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ফেরাতে পারে।’
বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে শহিদুল আলম জানান, প্রথম যাত্রায় তারা নিজেদের খরচে সফর করলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য সমর্থন পান। বিশ্বের অন্যান্য জায়গার অ্যাক্টিভিস্টরা নিজ দেশে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়েন—এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সমর্থন তাদের কাছে অর্থবহ ছিল। পরবর্তী অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগে সবচেয়ে বড় দুটি সহায়তা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এসেছে বলেও জানান তিনি।











