নজরুল জয়ন্তী আজ
তবুও পারিনি তোমায় ভুলিতে...

১৯২৩ সালের জানুয়ারি। কলকাতার এক ব্রিটিশ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো চব্বিশ বছরের এক তরুণ। পরনে মলিন পোশাক, চোখে অনির্বাণ দীপ্তি। অভিযোগ রাজদ্রোহ। কিন্তু সাক্ষ্য দেওয়ার আগেই যিনি বজ্রকণ্ঠে বলে ওঠেন, “আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার তরে ভগবান কর্তৃক প্রেরিত”— তিনি আর আসামি থাকেন কী করে! বিচারক হতবাক। আদালত স্তব্ধ। এ যেন আসামির কাঠগড়া নয়, হয়ে উঠল ইতিহাসের মঞ্চ।
সেই তরুণের নাম কাজী নজরুল ইসলাম। আর সেই জবানবন্দী, ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, হয়ে রইল বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য দলিল—যেখানে কবি নিজেই নিজের বিচারক, আর শাসকের আসন কেঁপে ওঠে সত্যের উচ্চারণে। এই দৃশ্য শতবর্ষ পরেও আমাদের শিহরিত করে, কারণ এ শুধু এক কবির সাহসিকতা নয়, এ এক জাতির বিবেকের জাগরণ-গাথা। এখানেই নিহিত জাতীয় সাহিত্যে নজরুলের অপরিসীম, চিরন্তন গুরুত্ব।
নজরুলের এই দুর্দম সাহস হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। চুরুলিয়ার দরিদ্র গ্রাম থেকে উঠে আসা ‘দুখু মিয়া’র সমগ্র জীবনই এক বিস্তৃত ভূখণ্ডের রসে জারিত। লেটোর দলে গান গেয়ে গ্রাম-বাংলা চষেছেন, চায়ের দোকানে ‘বয়’-এর কাজ করেছেন, বর্ধমানের রেলগাড়িতে খানসামাগিরি করেছেন, আবার ময়মনসিংহের দরিরামপুর স্কুলে হয়েছেন অবৈতনিক ছাত্র। এই যে ছোটবেলা থেকেই নানা ভূগোল, নানা বেদনা, নানা শ্রেণির মানুষের হৃৎস্পন্দন—নিজের চোখে দেখা, নিজের চামড়ায় মাখা—এ-ই তাঁর কবিতাকে দিয়েছে মাটির গন্ধ আর আকাশের বিদ্রোহ। তিনি হাফিজের ভাবশিষ্য, ওমর খৈয়ামের অনুবাদক হয়েও তাঁর সৃষ্টির রসভাণ্ড একেবারেই এই উপমহাদেশের লোকায়ত ধুলো-কাদা-জলে ভেজা। এই মাটিতে পা রেখেই তিনি বলতে পেরেছেন, “ফেনাইয়া ওঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান/ ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার।”
তবে শুধু বিদ্রোহই নজরুলের একমাত্র পরিচয় নয়। তিনি প্রেমিক কবিও বটে, আর সেই প্রেমেই লুকিয়ে তাঁর মানবিকতার গভীরতম প্রকাশ। রাধা-নিবেদন, বিরহ, আকুলতা— যেখানে তিনি লেখেন, “ক’রেছিলাম চাউনি চয়ন নয়ন হ’তে তোর,/ ভেবেছিলুম গাঁথব মালা পাইনে খুঁজে ডোর!”—সেখানে বোঝা যায়, প্রকৃত প্রেমিকই হতে পারেন সবচেয়ে বড় বিদ্রোহী। কারণ অন্যায়কে সহ্য করার অক্ষমতা ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয়। তাঁর ‘আগমনী’র ছন্দ-কারুকার্য, ‘প্রবর্তকের ঘুরচাকায়’র তাল-লয়—এ সবই প্রমাণ করে নজরুল বাংলা ভাষার এমন এক অভিভাবক কবি, যিনি উর্দু-ফারসি-আরবি-হিন্দির শব্দসম্ভারকে অনায়াসে বাংলার ঘরোয়া ঢঙে মিশিয়ে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক এক সাহিত্যভাষা নির্মাণ করেছিলেন। লেটোর দলের তারল্য ও সহজাত ছন্দজ্ঞান তাঁকে এমন এক তালিম দিয়েছিল, যা কোনো অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ দিতে পারত না।
কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র কি এই কবির কাছে নিজেদের ঋণ স্বীকার করে? বাস্তব চিত্রটি হৃদয়বিদারক। নজরুল-গানের সুর-সংকলনের মতো এক অমূল্য জাতীয় সম্পদের কাজ তাঁরই নামে গড়া নজরুল ইনস্টিটিউটে আটকে আছে দুই দশকেরও বেশি সময়। শুধুই আটকে নেই, পচে যাচ্ছে—শিল্পীদের অন্তর্কোন্দল আর রাষ্ট্রীয় অবহেলার অনাগ্রহে। এ যেন এক বিস্মৃতির ষড়যন্ত্র। অথচ এই কবিই ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতায় প্রথম লিখেছিলেন ‘জয় বাংলা’ শব্দগুচ্ছ, যা আজ বাঙালির জাতীয় স্লোগান। তাঁর ‘বাঙালির বাঙলা’ প্রবন্ধের শেষ পঙ্ক্তিও— “বাঙলা বাঙালির হোক; বাঙলার জয় হোক, জয় বাঙলা”।
তাই নজরুলকে কেবল রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা আর ভক্তির মোড়কে বেঁধে রাখার দিন শেষ। সময় এসেছে নতুন প্রজন্মের হাতে সেই ধূমকেতু তুলে দেওয়ার, যে অগ্নি-মশালের কথা তিনি বলেছিলেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’তে। যতদিন সমাজে শোষণ থাকবে, ধনী-গরিবের বৈষম্য থাকবে, ততদিন নজরুল বেঁচে থাকবেন। থাকবেন প্রতিবাদী ফেস্টুনে, জাগরণের গানে, ভালোবাসার চিঠিতে। আর তাই আজকের প্রজন্মকেই উচ্চারণ করতে হবে সেই চিরন্তন আহ্বান— ‘লাথি মার ভাঙরে তালা’? কে করবে আর দুঃশাসনের রক্তপান?” এই প্রশ্নই নজরুলের সামাজিক গুরুত্বের মূলমন্ত্র।
লেখক, সাহিত্য সম্পাদক, আগামীর সময়






