দৃকে ‘ফ্লোটিলা : বাংলাদেশ সেইলস ফর গাজা’

ছবি: আগামীর সময়
দৃক পিকচার লাইব্রেরির আয়োজনে ‘ফ্লোটিলা : বাংলাদেশ সেইলস ফর গাজা’ শীর্ষক প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়েছে। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার পান্থপথের দৃকপাঠ ভবনে প্রদর্শনীটির উদ্বোধনী আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রদর্শনীতে দুই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি জুবায়ের ইসলাম খান ও মোহাম্মদ আলী (লিয়াকত) এবং বাংলাদেশি শহিদুল আলমের গাজামুখী যাত্রার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। তারা অবরুদ্ধ গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের অবৈধ অবরোধকে চ্যালেঞ্জ করার প্রচেষ্টায় ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়লিশন (এফএফসি)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ যাত্রায় অংশ নেন।
উদ্বোধনী আয়োজনে তিন ফ্লোটিলা অ্যাক্টিভিস্টের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস. ওয়াই. রমাদান এবং দৃকের জেনারেল ম্যানেজার ও প্রদর্শনীটির কিউরেটর এএসএম রেজাউর রহমান।
প্রদর্শনী নিয়ে এএসএম রেজাউর রহমান বললেন, ‘প্রদর্শনীটি খুব সাধারণ একটি প্রদর্শনী। এই তিনজন কীভাবে সেখানে গিয়েছিলেন এবং তারা কী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তার খুব সরলীকৃত একটি উপস্থাপন। এর একটি অংশে আছে কেৎজিয়েত কারাগারের একটি শৈল্পিক উপস্থাপন। শিল্পী সোফিয়া করিম ওই তিনজনের সঙ্গে আলাপচারিতার ভিত্তিতে তাদের অভিজ্ঞতার তিনটি পৃথক ঘটনার মডেল তৈরি করেছেন। সেই মডেলগুলোও প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে।’
মোহাম্মদ আলী (লিয়াকত) বললেন, ‘গ্যালারিতে আপনারা যা দেখবেন এবং আমাদের কাছ থেকে যে গল্পগুলো শুনবেন, সেগুলো আমার জন্য এবং সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণিকা। এই যাত্রায় আমরা নানা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেমন সেখানে যাওয়া, ইসরায়েলিদের হাতে আটক হওয়া, হয়রানি ও অপমানের শিকার হওয়া এবং আমাদের কয়েকজনের আহত হওয়া। তবু আমাদের অভিজ্ঞতা ফিলিস্তিনি ভাইবোন ও শিশুদের প্রতিদিনের দুর্ভোগের তুলনায় অনেক কম গুরুতর। কয়েকজনকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। আমাদের কিছু সহযোদ্ধাকে খুব কাছ থেকে প্লাস্টিক বুলেট দিয়ে গুলি করা হয়েছিল, যা তাদের শরীরের মাংস ভেদ করে যায়। কিন্তু আমরা কখনো ভুলে যেতে পারি না যে, আমরা যা সহ্য করেছি, তার চেয়েও অনেক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিরা যাচ্ছেন। আমাদের নিজেদের গল্প যতই মর্মান্তিক বা বেদনাদায়ক হোক না কেন, মূল মনোযোগ সব সময় ফিলিস্তিন এবং ফিলিস্তিনিদের চলমান দুর্ভোগের ওপরই থাকতে হবে, ফিলিস্তিন স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত।’
জুবায়ের ইসলাম খান বললেন, ‘এই মিশন আমাকে আমার মাতৃভূমির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করেছে, যা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। এটি আমাকে আমাদের পতাকা এবং এর প্রতিনিধিত্ব করা মূল্যবোধগুলোর প্রতি আরও গভীর উপলব্ধি দিয়েছে। বহু বছর ধরে আমি কখনো কখনো ভাবতাম, একজন কৃষকের নাতি হিসেবে আমার মতো কেউ কীভাবে পৃথিবীতে অর্থবহ বা উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব রাখতে পারে। কিন্তু এ ধরনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সবচেয়ে সাধারণ মানুষও ইতিহাস বদলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এই অভিজ্ঞতা আমাকে দেখিয়েছে যে, মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে এবং বিশেষ করে ফিলিস্তিনের মানুষের পাশে দাঁড়ালে বাংলাদেশিরা সংহতির মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। হয়তো আমি সেই স্বাধীনতা এনে দেওয়ার মানুষ হব না, তবে আমি আশা করি, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের কোনো অ্যাক্টিভিস্ট এটি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবেন।’
শহিদুল আলম বলেছেন, ‘প্রদর্শনীতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দুটি ঘটনার সমন্বিত উপস্থাপন দেখা যাবে : প্রথম ফ্লোটিলা মিশনটি ছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে, আর সাম্প্রতিক মিশনটিতে জুবায়ের অংশ নিয়েছিলেন এ বছরের মে মাসে। রেজা দুটি অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে একত্র করেছেন, যা খুব কার্যকরভাবে ফুটে উঠেছে। তবে আমাদের পেছনে রেখে আসা মানুষগুলোকেও মনে রাখতে হবে, যেমন আমাদের প্রিয়জন, পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীরা। তারাও নিজেদের মতো করে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। বিশেষভাবে আমাদের তাদের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত, যারা সবকিছুর পরও প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের সাহস আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা ফিলিস্তিনিদের বহন করা অনেক গভীর ও ব্যাপক দুর্ভোগের কেবল সামান্য একটি আভাস দেয়।’
তিনি বলেছেন, ‘যখন অনেক সরকার নীরব ছিল বা সহযোগীর ভূমিকা নিয়েছিল, তখন বাংলাদেশের নেতারা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন বলে আমি গর্বিত। তারেক রহমান, যিনি সে সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, আমাদের মিশনের সমর্থনে স্পষ্টভাবে বক্তব্য দেওয়া প্রথম নেতাদের একজন ছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, আমাদের কোনো ক্ষতি হলে বাংলাদেশ আমাদের পাশে দাঁড়াবে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান উপদেষ্টা, তিনিও আমাদের উদ্যোগের পক্ষে শক্তিশালী সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন। যখন বিশ্বের বহু নেতা মুখ খুলতে ব্যর্থ হয়েছেন, তখন তাঁদের এই নৈতিক সাহস গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লিয়াকত ও আমি প্রথম দেখা ইসরায়েলের কারাগারে। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, পরবর্তী ফ্লোটিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব একটি নৌযান থাকবে। এখানে উপস্থিত কয়েকজনসহ আরও অনেক মানুষের অনুদানে আমরা অর্থ সংগ্রহ করে একটি নৌকা কিনতে সক্ষম হই। সেটি বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে যাত্রা করেছিল, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত অর্থবহ ছিল।’
ইউসুফ এস. ওয়াই. রমাদান বললেন, ‘আপনাদের উপস্থিতি ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি, ন্যায়বিচারের প্রতি এবং স্বাধীনতার প্রতি আপনাদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। এই সংগ্রাম সহজ নয়, আর সংহতি শুধু কথায় বা অনলাইন সমর্থনে সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিশ্রম, সাহস ও ত্যাগ। কিন্তু স্বাধীনতা ও মর্যাদা সেই মূল্য দেওয়ার যোগ্য। দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা উচ্ছেদ, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছেন। তবু আমরা মুছে যাব না, বিস্মৃতও হব না। যত দিন আমাদের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে, তত দিন আমরা প্রতিরোধ চালিয়ে যাব। আপনাদের সমর্থন নিয়ে আমরা হাল ছাড়ব না। যত কষ্ট, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি বা ক্ষতিই হোক, ফিলিস্তিনিরা স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। দয়া করে আমাদের ছেড়ে যাবেন না।’
প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে একই শিরোনামে প্যানেল আলোচনা ‘ফ্লোটিলা : বাংলাদেশ সেইলস ফর গাজা’ অনুষ্ঠিত হবে শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় একই দৃকপাঠ ভবনের লেভেল ৮-এ। আলোচনায় ভিন্ন ভিন্ন জাহাজে থাকা তিন ফ্লোটিলা অ্যাক্টিভিস্ট গাজার ওপর ইসরায়েলের অবৈধ অবরোধকে চ্যালেঞ্জ করার তাদের অভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন।
‘ফ্লোটিলা : বাংলাদেশ সেইলস ফর গাজা’ প্রদর্শনীতে বিভিন্ন আলোকচিত্র, ভিডিও ফুটেজ এবং আর্কাইভাল নানা উপকরণের মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের সেই যাত্রার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের নৌযানকে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী (আইওএফ) অবৈধভাবে আটক করার ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে তাদের বেআইনিভাবে ইসরায়েলের কেৎজিয়েত কারাগারে স্থানান্তরের বিষয়ও উঠে এসেছে।
প্রদর্শনীটি ২৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে, যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।






