প্রয়াণদিবসে স্মরণ
জাতীয় কবি বিপ্লবের কবি বিদ্রোহের কবি

সংগৃহীত ছবি
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় সত্তা কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে ১৩০৬ সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। নজরুল ইসলাম শৈশবেই পিতৃহীন হন। পরিবারের অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে মানুষ হন তিনি এবং কবি প্রতিভার ক্রমবিকাশ ঘটান। তাঁর ডাকনাম দুখু মিয়া।
বাল্যকাল থেকেই তিনি ধর্মের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। বাড়ির নিকটস্থ মসজিদে কিছুদিন ইমামতি করেছিলেন। দশ বছর বয়সে গ্রামের মক্তব হতে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে এই মক্তবে এক বৎসর শিক্ষকতা করেন। এগারো বৎসর বয়সে নজরুল ইসলাম অর্থ রোজগারের জন্য লেটোর দলে প্রবেশ করেন। সময়োপযোগী গান, যাত্রা, নাটক, রচনা করে গ্রামে-গ্রামে গিয়ে অভিনয় করতে থাকেন। সংসারে অভাব তীব্র হয়ে উঠায় কবি কিছুদিন আসানসোলের এক রুটির দোকানে চাকরি করেছিলেন। বেতন ছিল আট টাকা। এরপর আসানসোল থানার দারোগা হাফিজ উদ্দিনের সহযোগিতায় ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলে এক বছর পড়ালেখা করেন। এরপর রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজস্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলে তিনি তিন বৎসর পড়ালেখা করেন।
তিনি ১৭ বৎসর বয়সে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে ৪৯নং বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। সৈন্যদলে থেকেও তিনি সাহিত্য সাধনা অব্যাহত রাখেন। বাঙালী পল্টনে ফার্সি ভাষার অভিজ্ঞ একজন পাঞ্জাবি মৌলভীর কাছে ফার্সি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ফার্সি ভাষার কবিদের প্রায় সব বই পড়ে নেন। এসময় তিনি ইরানের মরমী কবি হাফিজের কবিতার অনুবাদ ‘রুবাইয়াৎ-ই- হাফিজ’ অনুবাদের অনুপ্রেরণা লাভ করেন।
করাচীর সৈনিক জীবনে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটে। করাচী ব্যারাকে ‘রিক্তের বেদন’ গ্রন্থ সহ অসংখ্য গান, কবিতা, গল্প তিনি রচনা করেন। নজরুল ইসলামের প্রথম রচনা ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ কলকাতার সওগাত পত্রিকায় ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়। এই সময় পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের চেষ্টায় হাফিজের একটি গানের অনুবাদ প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
করাচীতে তিন বৎসর সৈন্যদলে থেকে নজরুল ইসলাম ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় আসেন। কলকাতায় এসে পুরোপুরিভাবে সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। একই বৎসর বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক মোজাফফর আহমদের বাসায় তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লেখা হয়। কবিতাটি ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে কবি চারিদিকে প্রশংসিত হন। দেশব্যাপী তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কবিতাটির প্রথম চরণ, বল বীর-বল উন্নত মম শির। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল ইসলাম ‘ধূমকেতু’ নামে একটি অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।
নজরুল ইসলাম দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার প্রাণে দেশপ্রেম জাগিয়ে আন্দোলন সফল করে তোলার উদ্দীপ্ত আহ্বান জানান। বাংলার বিপ্লবীদের অভিনন্দন জানান। তাই তাঁর ‘ধূমকেতু’ প্রকাশের সময় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে আশীর্বাদ পাঠিয়েছিলেন। ‘ধূমকেতুর’ উপর ব্রিটিশ সরকার প্রথম থেকেই খড়গহস্ত ছিল। ফলে বেশিদিন তিনি ‘ধূমকেতু’ চালাতে পারেননি। সরকার তাঁকে কারাবন্দী করে। কারাগার নজরুল ইসলামের বিপ্লবী কবি প্রতিভার স্রোতকে স্তব্ধ করতে পারে নাই।। কারাগারে বসেও তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন। ‘ডাঙার গান’ শিরোনামের একটি গান নিম্নরূপ,
‘কারার ঐ লৌহ-কবাট
ভেঙে ফেল্, কর্রে লোপাট
রক্ত- জমাট
শিকল-পূজোর পাষাণ-বেদী!’
এই কারাগারেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক নজরুল ইসলামের প্রতি উৎসর্গ করে পাঠান। প্রচলিত সংস্কার ও রাজনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা নজরুলের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। চিন্তায় ও কর্মে, স্বাধীনতা এবং আত্মচেতনার স্পষ্ট প্রকাশ ছিল নজরুলের।
তিনি বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারায় এবং বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিদ্রোহী কবি বলে পরিচিত। কবি নজরুল ইসলাম নিজের দেশকে, দেশের মানুষকে ভালবেসেছেন। মানবতার জন্য আকুতি, বেদনা ও বিচিত্র অনুভূতি তার গদ্যে-কবিতায় কোমল ও কঠোরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। দাসত্ব ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তার উচ্চারণ ছিল বজ্রকণ্ঠ। অন্যায়-বৈষম্যের বিরুদ্ধে অত্যাচার- নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণমানুষের পক্ষে লেখার মাধ্যমে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তিনি ছিলেন মানবতার কবি। মানবতার পূজারী কবি নজরুল ইসলাম তার সাম্যবাদী কবিতাগুলোতে মানুষকে মহান করে তুলে ধরেছেন। তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন,
‘গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’
দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় আন্দোলনে যুব সমাজ অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারে। সকল সত্য ও কল্যাণ কামনার সাথে যুব সমাজের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। তাই কাজী নজরুল ইসলাম দেশের যুব শক্তিকে বার বার আহবান জানিয়েছেন। নিপীড়িত ও অধঃপতিত মানুষকে জীর্ণ সমাজ ও বিপন্ন পরিবেশ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে নজরুল অসংখ্য গান ও কবিতায় যৌবনের জয়গান করেছেন। এজন্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘যৌবনের কবি’ ও ‘মানবতার কবি’ বলে সুপরিচিত।
বাংলাসাহিত্যের বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিমাণ অনেক, লিখেছেন চার হাজারের বেশি গান, সম্পাদনা করেছেন একাধিক পত্রিকা, সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিলেন রাজনীতিতে, সংযোগ ছিল মানবকল্যাণমূলক অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
জীবনের সাথে সম্পৃক্ত এমন কোনো বিষয় পাওয়া যাবে না যেখানে নজরুল অনুপস্থিত। মানুষের জীবনের উপাখ্যান নিয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁর ছোটগল্প, প্রেম ও নানা মনোসংঘাত কিংবা মনের সাথে বাহ্যিক জগতের নানা দ্বন্দ্ব-ব্যাকুল কথকতা নিয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁর কথাসাহিত্য, উপন্যাস। জীবনের গভীর উপলব্ধি ও নানা দার্শনিক বোধসম্পৃক্ত সুখানুভূতি ও বেদনা নিয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁর কাব্য ও সংগীত, সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর চিঠিপত্র এবং নাট্যাঙ্গিকে রচিত নানা সৃষ্টিমালা। সাহিত্যের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে নজরুল বিচরণ করেননি।
নজরুল খুব অল্প সময় বাংলাসাহিত্যকে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। মধ্যবয়সে এক দুরারোগ্য রোগে কবি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ১৯৪২ সালের শেষের দিকে তিনি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। ২৩ বছরের সাহিত্যিক জীবনে তার প্রকাশিত কবিতার বই ২২টি, নানা বিদেশি কবির কবিতার অনুবাদের বই ৩টি আর ছোটদের কবিতার বই ২টি। এছাড়া তাঁর রচিত উপন্যাস ৩টি, গল্পের বই ৩টি, নাটক ৩টি, ছোটদের নাটক ২টি, প্রবন্ধের বই ৫টি আর গানের বই ১৪টি। নজরুল সুস্থ থাকতে থাকতেই প্রায় ৫০টির মতো বই প্রকাশিত হয়। তার মৃত্যুর আগেই প্রকাশিত হয় আরও ৩০টির মতো বই। আর তার মৃত্যুর পর অপ্রকাশিত রচনা নিয়ে আরও ১১টি বই প্রকাশিত হয়েছে।
কবি নজরুলের লেখায় অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিতদের অধিকার আদায়ের দাবি অন্যতম স্পষ্ট ও সোর হয়ে উঠেছে। অন্যায়, অসত্য, নির্যাতন, পরাধীনতার গ্লানি ও শৃঙ্খলা মোচনে কবির দীপ্ত উচ্চারণ যুগ যুগ ধরে মানুষকে সাহসী হওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণী-মনসা’, ‘জিঞ্জির’, ‘সন্ধ্যা’ ও ‘প্রলয়শিখা’ কাব্যগ্রন্থে কবির বিদ্রোহরূপ পরিস্ফুটিত হয়েছে।
উল্লেখ, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয়া বাংলাদেশ নামকরণের সাথে কাজী নজরুল ইসলাম এক হয়ে মিশে আছেন। ১৯৩১ সালে প্রকাশিত একটি গানে তিনি প্রথম ‘বাংলাদেশ’ নামকরণের কথা উল্লেখ করেন। সে সময়ের সাহিত্যে আমাদের এ অঞ্চলকে কোথাও ‘বঙ্গ’, কোথাও শুধু ‘বাংলা’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। নজরুলই প্রথম ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ করেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মান সূচক ডি লিট ডিগ্রী প্রদান করা হয়।
১৯৭৬ সালে তাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পদক একুশে পদক প্রদান করা হয়। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ হতে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন।
চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাংলা তারিখ ১৩৮৩ সনের ১২ ভাদ্র। মসজিদের পাশে তাকে কবর দেওয়ার জন্য তিনি তার ‘গানে’ বলেছেন। ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই/যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।’ তাই নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবর দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বেঁচে ছিলেন ৭৭ বৎসর। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ৩৪ বৎসর বোধ ও বাকশক্তিহীন অবস্থায় ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই দিকপাল সাহিত্য রচনা করেছেন মাত্র ২২ বৎসর। এর মধ্যে তিনি রচনা করেছেন- কবিতা, গান, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাস। বাংলাদেশের রণসঙ্গীত করা হয়েছে তার রচিত ‘চল্ চল্ চল্’ গানটি। আমাদের জাতীয় চেতনার নবজাগরণে, সমাজ-সংস্কৃতির স্বকীয়তা বিনির্মাণে, সুশাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নজরুলের সৃজনশীল রচনা ও সংগ্রামী জীবন আমাদের অফুরন্ত প্রেরণার উৎস ।
জায়েদুল আলম
লেখক: শিক্ষাবিদ ও গবেষক
[email protected]







