বোন দরজাটা খোল, তোরে কিছু কমু না : স্বপ্নাকে বলেছিলেন রামিসার মা

আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসেছেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। ছবি : আগামীর সময়
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় তার মা পারভীন আক্তার আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আজ মঙ্গলবার ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন তার সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, নিজের মেয়েকে ফিরে পেতে আসামি স্বপ্নার কাছে এই মায়ের আকুতি। তিনি স্বপ্নাকে বলেছিলেন, ‘বোন দরজাটা খোল, তোরে কিছু কমু না।’
এদিন দুই আসামিকে বিচারিক আদালতে তোলা হয়। পরে ১০টা ৩৫ মিনিটে বিচারক এজলাসে উঠেন। প্রথমে মামলার বাদী আবদুল হান্নান মোল্লার সাক্ষ্য গ্রহণ করেন বিচারক। এরপর রামিসার মা পারভীন আক্তার জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে রামিসার মা পারভীন আক্তার বলেছেন, ঘটনার দিন ১৯ মে আমি রান্না করতেছিলাম। রান্নার শেষ পর্যায়ে বড় মেয়ে রাইসা আক্তারকে তার চাচা গোলাম মোস্তফার বাসায় যেতে বলি। তখন ছোট মেয়ে রামিসা আক্তার বলে, ‘আম্মু আমিও যাব’। রান্নাঘর থেকে বুঝতে পারি, দুজন রেডি হচ্ছে। তবে বড় মেয়ে রাইসা তাকে রেখে বের হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারিনি যে ও রামিসাকে নিয়ে যায়নি। পরে রান্নাঘর থেকে একটা চিৎকার শুনতে পাই। পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চা চিৎকার দিচ্ছে ভেবে আমি তখন পাত্তা দিইনি। কিছুক্ষণ পর দেখি দরজা খোলা। ভাবলাম তারা (দুই মেয়ে) কি দরজা খোলা রেখে চলে গেল? কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে রাইসা একা বাসায় ফিরে আসে। তাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘রাইসা তুমি একা কেন, রামিসা কোথায়?’ নিচে গিয়ে দেখি রামিসা সেখানে নেই।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলছিলেন, রামিসাকে খুঁজে না পেয়ে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করেছি, তাকে দেখেছে কি না। নিচের ছোট রুম খুলে পাইনি, দোতলায় ব্যাচেলরদের রুম চেক করেও পাইনি। তারপর তিন তলায় এসে রুমের দরজায় ধাক্কা দিলে দেখি খোলে না। তখন দরজার সামনে নিচে দেখি আমার মেয়ের একটা জুতা পড়ে আছে। তখন আমি চিৎকার করি। এ সময় বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে লোকজন আসেন। তারা এসেও দরজা ধাক্কা দিলেও খুলেনি। পরে নিচ থেকে ১০-১২ জন লোক আসেন।
স্বামী আব্দুল হান্নান মোল্লার কথা উল্লেখ করে স্ত্রী পারভীন আক্তার জানান, এ সময় আমার স্বামী ফোন পেয়ে অফিস থেকে আসেন। দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে দেখি, বাথরুম রক্তে ভরা। আমার মেয়ের মাথা এক জায়গায়, দেহ আরেক জায়গায়।
‘‘ওই ফ্ল্যাটে তখন আসামি স্বপ্নাকে দেখি। তাকে বলেছিলাম, ‘বোন দরজাটা খোল, তোরে কিছু কমু না’। তারপরও সে দরজা খোলেনি। এরপর পুলিশ আসে। পরে শুনেছি, সোহেল রানা আমার মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করে গ্রিল কেটে পালিয়ে গেছে’’, যোগ করেন রামিসার মা পারভীন।
এদিন বেলা ১১টা ২১ মিনিটে তার জবানবন্দি শেষ হয়। জেরাতে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ তাকে একাধিক প্রশ্ন করেন। পরে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে তিনি আদালত থেকে বের হন।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামি সোহেল রানা কৌশলে তাকে একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলার রুমে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আসামিদের রুমে রামিসার উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাডাকি করেন তার মা।
ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দাদের ডেকে এনে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে সোহেল ও স্বপ্নার শোয়ারঘরে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বালতির মধ্যে কাটা মাথা দেখতে পান তারা। এ সময় স্বপ্না সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ঘটনার দিনই শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন। মামলার পর প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরদিন ২০ মে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। একই দিন আদালত আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তদন্ত শেষে ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। এতে আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়।
ওই দিনই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন এবং মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় তা বদলির আদেশ দেন। একই দিন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১ জুন দিন ধার্য করেন।
পরে গত সোমবার (১ জুন) আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দেন।






