আলোচনা সভায় অভিমত
গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনার কাজটি এখনো চলছে

ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে আজ রবিবার ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংস্কারের গুরুত্ব’ শীর্ষক এই মুক্ত আলোচনায় আলোচকরা। ছবি: দৃক
প্রতিশ্রুতি ছিল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, তবে তার বিপরীতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাই করা হচ্ছে বলে অভিমত এসেছে এক আলোচনা সভায়।
ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে আজ রবিবার ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংস্কারের গুরুত্ব’ শীর্ষক এই মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও সাংবাদিকতার শিক্ষকরা অংশ নিয়েছিলেন।
আয়োজকরা জানান, দেশের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছিল, যা এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ফলে এসব সুপারিশকে টেকসই সংস্কারে রূপ দেওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই এই আলোচনার আয়োজন।
আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন বলেন, ‘গণমাধ্যমকে কীভাবে আরও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, নির্বাচিত সরকার সেই একই চেষ্টা করছে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বিএনপির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনাও করেন।
‘বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলা আছে। অন্তর্বর্তী সরকারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু কাজের বেলায় কেউ নেই,’ বলেন তিনি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সাংবাদিকদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন।
তিনি বলেন, ‘একটা দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা কী রকম হবে, তার সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংস্কারের প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত ৩০ বছরে দেশে কোনো মিডিয়া কমিশন হয় নাই এবং ৩০ বছর ধরেই দেশের মিডিয়া বদলে যাচ্ছে, এখনো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখনো যদি আমরা উদ্যোগ না নেই, তাহলে আমরা যে ভাবি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে, সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে কাজ করবেন, তার কোনো কিছুই আর সম্ভব হবে না।’
প্রায় একই সুরে কথা বলেন নেত্র নিউজের প্রধান সম্পাদক তাসনিম খলিল। তার ভাষ্যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো সরকার এনে দেবে না, নিজেদের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে নিজেদেরই তা আদায় করে নিতে হবে।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দু-একটি মিডিয়া বাদে কোনো মিডিয়াতে সম্পাদকীয় নীতিমালা নেই।’
সাংবাদিকদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনের বিষয়টি চিহ্নিত করে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, ‘আমাদের সাংবাদিক সংগঠন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। যেটা আমরা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে করে ফেলেছি। আমরা দেখেছি বিএফইউজে (বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন), ডিইউজে (ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন) নেতারা প্রেস ক্লাবে বাঘ-সিংহের মতো চলাফেরা করতেন, আর বিএনপি ও জামায়াতপন্থীরা বেড়ালের মতো। এখন রাতারাতি উল্টে গেছে। বাঘ হয়েছে বেড়াল, আর বেড়াল হয়েছে বাঘ!’
স্বাধীন সাংবাদিকতার বাধা হিসেবে গণমাধ্যমের মালিকানার প্রশ্নটি তুলে ধরে খুলনা অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নির্ধারণ করেন মালিকপক্ষ। তারা না চাইলে গণমাধ্যম কখনো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে না।’
আলোচনায় বক্তব্যে সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্সের (অ্যাটকো) মহাসচিব এবং একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুস সালাম।
তিনি বলেন, এ আইনের প্রয়োজনীয়তা আছে, তবে সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিতে হবে। সাংবাদিকদের প্রতি নিপীড়নমূলক আইন মেনে নেওয়া হবে না।
দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় আরও যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, প্রথম আলোর উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়া, দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সুমন রহমান, আইনজীবী নজরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও প্রধান শিবলী নোমান, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও সাংবাদিক জিমি আমির এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এস এম রেজওয়ান উল আলম, নেত্র নিউজের সাংবাদিক ডেনিম চাকমা।



