টিএসসির ‘ফিমেল জোন’ ঘিরে বিতর্ক

ছাত্র-শিক্ষককেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্র-শিক্ষককেন্দ্রের (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়া। আড্ডা আর মুক্তচিন্তার প্রথাগত এক মিলনমেলা। সেই পরিচিত আঙিনায় হঠাৎ নতুন বিতর্ক। একটি পর্দা আর একটি টেবিল ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা মত। বিষয়— ‘ফিমেল জোন’। নারী শিক্ষার্থীদের আলাদা বসার এই আয়োজন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার দুপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়াবিষয়ক সম্পাদক উম্মে সালমা উদ্যোগ নেন টিএসসিতে এই জোন চালুর। উদ্বোধন করেন ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিএসসির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ফারজানা বাসার। ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে দুই পাশে দুটি পর্দা এবং মাঝখানে একটি টেবিল দিয়ে চালু করা হয় এই ‘ফিমেল জোন’। যদিও এটি উদ্বোধনের পরপরই ক্যাম্পাসে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পক্ষে-বিপক্ষে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এমন উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করছেন। তাদের ভাষ্য, পর্দানশীন নারী শিক্ষার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যে খাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সমালোচনাও কম নয়। শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশের দাবি, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। আসল প্রয়োজন ছিল পরিষ্কার ওয়াশরুম, স্যানিটেশন এবং খাবারের মানোন্নয়ন। কিন্তু বাস্তব এই সমস্যাগুলো এড়িয়ে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করা হয়েছে।
এই বিতর্ক স্পষ্ট হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের ফেসবুক গ্রুপ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ-২’-এ। সেখানে পক্ষে এবং বিপক্ষে নানা মত উঠে আসে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ডাকসুকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আবার একটি অংশ এই উদ্যোগকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ‘নারী ও পুরুষের মধ্যে সামাজিক পৃথককরণ’ ইত্যাদি বিশেষণে অভিহিত করে সমালোচনা করেন।
ছাত্রদলনেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলমের দাবি, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বললেন, ‘কমনরুম, যেটা মূলত মেয়েদেরই জায়গা, সেখানে পর্দা কর্নারটা কীসের জন্য? কাদের সুবিধার জন্য? মেয়েরা বোধ হয় আর কোনো কাজের পলিটিক্যাল ইমপ্যাক্ট নিয়ে ভাবে না। যার জন্য এরা (ডাকসু) এই সুবিধাটা নেওয়ার চেষ্টায় আছে।’
ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বাস্তব সমস্যা এড়িয়ে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। তিনি বললেন, ‘নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে হলে প্রথমে টিএসসির নারী ওয়াশরুমের অবস্থা উন্নত করা এবং স্যানিটেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল।’ তার দাবি, এসব বাস্তব সমস্যা উপেক্ষা করে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা হচ্ছে।
ডাকসু নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তি) থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আব্দুল কাদেরের মতে, উদ্যোগটি আপাতদৃষ্টিতে ভালো। কিন্তু এটি যেন ভবিষ্যতে কোনো ছাত্রসংগঠনের “ফিমেল উইং”- এর টিএসসি শাখা অফিসে পরিণত না হয় সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার আহ্বান তার।
বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ডাকসুর প্রশংসাও করেছেন। ফাহিমা শারমিন নামে এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘ফিমেল জোন করাতে কারও অধিকার কমে যায়নি, কারও স্বাধীনতায়ও হস্তক্ষেপ করা হয়নি। তাহলে আপত্তি কেন? আপনার ইচ্ছা হলে বসবেন, নাহলে বসবেন না। এটাকে তো আমি বিভাজন হিসেবে দেখি না। বরং এটা ক্যাফেটেরিয়ার পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করে। বিশ্ববিদ্যালয় সবার প্রয়োজন ও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করে, বিষয়টাকে পয়েন্ট আউট করে।’
বিতর্কের মুখে ব্যাখ্যা দিয়েছেন উদ্যোক্তা উম্মে সালমা। তার ভাষ্য, নিজের ব্যক্তিগত ফান্ডের টাকায় এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাউকে বসতে বাধ্য করা হচ্ছে না। রাজনৈতিক হীনম্মন্যতা থেকে একে ‘পর্দা কর্নার’ হিসেবে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন।
সমালোচনার বিষয়ে বললেন, ‘সমালোচনার বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। একটি পক্ষ বলছে, ডাকসু অনেক কাজ করেনি, এটা কেন করল? এটি সম্পূর্ণ তাদের হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ। আমি নাম দিয়েছি ফিমেল জোন, অথচ তারা প্রচার করেছে পর্দা কর্নার।’
এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেউ কেউ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ আগামীর সময়কে বললেন, ‘এই উদ্যোগ অবশ্যই দরকার ছিল এবং এইটা আরও আগেই করা উচিত ছিল। আমাদের নারী শিক্ষার্থীদের মাঝে মাঝে বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, অনেক সময় তাদের বাচ্চাদের বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন পড়ে, তখন এই ধরনের কর্নার জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় এই ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার না থাকায় অনেকেই সমস্যায় পড়েন। অবশ্য এই ধরনের জায়গাকে ফিমেল জোন হিসেবে নামকরণ করাটা ডাকসু ঠিক করেনি।’




